প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একটি সাধারণ সকাল, যেখানে একজন দাদার ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের গল্প লেখা হচ্ছিল, মুহূর্তেই তা রূপ নেয় হৃদয়বিদারক এক ট্র্যাজেডিতে। নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে আকরাম মোল্যা (৬০) নামে এক বৃদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকালে লোহাগড়া উপজেলার পূর্ব চর-কালনা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আকরাম মোল্যা উপজেলার চর বকজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, আর একটি পরিবারের ভরসার জায়গাটি হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতোই সেদিন সকালে আকরাম মোল্যা তার নাতি মাহিম মোল্যাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ছিল তার প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং ভালোবাসার একটি অভ্যাস। বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চর জঙ্গল মুকুন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নাতিকে পৌঁছে দিয়ে তিনি বাড়ির পথে রওনা দেন।
সাধারণত যে পথ দিয়ে তিনি চলাচল করতেন, সেদিনও সেই পথেই ফিরছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—পথের মধ্যে চর-কালনা এলাকায় রেললাইন পার হওয়ার সময় খুলনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে পড়ে যান তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাটি এতটাই দ্রুত ঘটে যে আশপাশের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। অনেকেই ছুটে এলেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মুহূর্তেই একটি হাসিমুখ পরিবারে নেমে আসে গভীর শোকের অন্ধকার।
খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীতে রেলওয়ে পুলিশকে অবহিত করা হয়। এ বিষয়ে লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন পারাপারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেক জায়গায় এখনও নিরাপদ পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই রেললাইন পার হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকায় রেললাইন পারাপারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিরাপদ ক্রসিং নেই। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করেন। তাদের মতে, যদি সেখানে একটি নিরাপদ ক্রসিং বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।
আকরাম মোল্যার পরিবারের সদস্যরা এই ঘটনায় শোকাহত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না হলেও তিনি ছিলেন পরিবারের প্রবীণ অভিভাবক, যার ওপর সবাই মানসিকভাবে নির্ভর করতেন। তার মৃত্যুতে পরিবারটি যেন দিকহারা হয়ে পড়েছে।
নাতি মাহিম, যে কিছুক্ষণ আগেই দাদার হাত ধরে স্কুলে গিয়েছিল, সে এখনো বুঝতে পারছে না কীভাবে তার প্রিয় মানুষটি হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। এই ঘটনাটি শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়, এটি একটি পরিবারের আবেগ, সম্পর্ক এবং ভালোবাসার বন্ধনের করুণ পরিণতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেললাইন পারাপারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেখানে মানুষের চলাচল বেশি, সেখানে নিরাপদ ক্রসিং, সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে, এলাকাবাসী দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।
সব মিলিয়ে, নড়াইলের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের সামনে আবারও তুলে ধরেছে জীবনের অনিশ্চয়তা এবং অবহেলার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একটি ভালোবাসার সম্পর্কের গল্প মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল, রেখে গেল অসংখ্য প্রশ্ন এবং গভীর বেদনা।