পাঁচ সমুদ্রপথে নির্ভরশীল বিশ্ব বাণিজ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার
যে পাঁচ সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের বাণিজ্য

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা বিশ্ববাণিজ্যের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান এ প্রণালি পার হতে চাওয়া এক ডজনের বেশি জাহাজে হামলা চালিয়ে চলাচল ব্যাহত করেছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র তেলের বাজারে নয়, কৃষি ও ভোক্তাপণ্যসহ বিশ্বের নানা ধরনের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৭০ ডলার, যা এখন ১১৫ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে।

বিশ্ব বাণিজ্য মূলত কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এই পথগুলোকে সামুদ্রিক বটলনেকস বলা হয়। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে, যা বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ পরিবহন করে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি জন্য বিকল্প পথ না থাকায় এই প্রণালির ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। ১৯৮০ সাল থেকে ইরান মাঝে মাঝে এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে, তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর।

হরমুজ প্রণালির এই পরিস্থিতি বিশ্ব তেলের বাজারে সরবরাহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এছাড়া এই প্রণালির মাধ্যমে প্রতিবছর ২৬ মিলিয়ন কন্টেইনার যাতায়াত করে, এবং বিশ্ব সার রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশও এই পথ ধরে চলে। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘমেয়াদী বাধা খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহণ খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি সমুদ্রপথ হলো সুয়েজ খাল, যা লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপের যাত্রাপথ অন্তত ১০ দিন কমায়। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ এই খাল দিয়ে পরিবহন হয়। সুয়েজ খালের সরাসরি হুমকির মুখে না থাকলেও, ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম নয়। এছাড়া লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিতাবে আল মানদাব প্রণালিতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

পানামা খাল প্রশান্ত ও আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্ত করে এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২.৫% নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও কন্টেইনারজাত পণ্য, গাড়ি ও উচ্চমূল্যের কার্গোতে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। খালের জলবায়ু ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি জলসীমার সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, যা জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলে।

মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪% এই পথ দিয়ে হয়। সমুদ্রপথে ক্রুড তেলের ১০% এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬% পরিবহন হয়। সিঙ্গাপুরের পাশেই অবস্থিত এই প্রণালি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি প্রবেশপথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে ১৩০টিরও বেশি জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে, যা এই প্রণালির নিরাপত্তা হুমকির প্রমাণ।

তার্কিশ প্রণালি (বসফোরাস ও দার্দেনেলিস) কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সমুদ্রপথ। বিশ্বের সমুদ্রবাণিজ্যের ৩% এখান দিয়ে হয়। ইউক্রেন, রাশিয়া ও রোমানিয়া থেকে মোট গম রপ্তানির ২০% এই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবহন হয়। মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী সামরিক প্রবেশাধিকার তুরস্কের হাতে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি এই পথকে অতিসংবেদনশীল করে তুলেছে।

এই পাঁচটি প্রণালি ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ২৪টি কৌশলগত সামুদ্রিক পয়েন্ট বা সমুদ্রপথ আছে, যেমন তাইওয়ান, ডোভার ও বেরিং প্রণালি। প্রতিটি ঝুঁকির মুখে থাকে—ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, পাইরেসি, জলদস্যুতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে। এটি প্রমাণ করে, বিশ্ব বাণিজ্য কতটা সীমিত সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির জন্য গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত