প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নোড হিসেবে বিবেচিত হরমুজ প্রণালিতে সম্প্রতি এক ধরনের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরান ৯ই এপ্রিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য একটি বিকল্প পথের ঘোষণা দিয়েছে। এটি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে তেহরান প্রণালিটি সাময়িকভাবে পুনরায় খুলে দিতে সম্মত হওয়ার সঙ্গে জড়িত। তবে এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি কতটা খোলা এবং কতগুলো জাহাজ নিরাপদে পার হতে পারছে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেলের এক-ভাগপঞ্চমাংশ পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, লেবাননে ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষিতে প্রণালিটি বন্ধ রয়েছে। দুটি ইরানি সংবাদমাধ্যমে একটি জাহাজ-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে, পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজ প্রণালির কাছে এসে ফিরে গেছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ফিরে যেতে হয়েছে।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেছেন, প্রণালিটি বন্ধ থাকার যে কোনো খবরই মিথ্যা। তিনি জানান, এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে যে প্রণালিটি কার্যকরভাবে খোলা রয়েছে।
বাণিজ্যিক জাহাজ দালাল সংস্থা এসএসওয়াই বিবিসি ভেরিফাইকে নিশ্চিত করেছে, উপসাগরের জাহাজগুলো ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)-এর কাছ থেকে বার্তা পেয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে এবং এই পথ দিয়ে যেতে হলে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর অনুমতি প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া প্রবেশের চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।’
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে চাওয়া সব জাহাজকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ম মেনে চলতে হবে। প্রণালিতে সমুদ্রে মাইন রাখা রয়েছে, যার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখনও আছে। তাই তারা জাহাজগুলোকে নিরাপদ রাখতে বিকল্প পথ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বিকল্প পথের নির্দেশনা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হরমুজ প্রণালিটি পুনরায় খুলতে চাপ দিচ্ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সময় ইরানের অনড় অবস্থার জন্য তাদের নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে ৭ ও ৮ এপ্রিল মধ্যরাতে দুই দেশের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া যায়। মার্চ মাসের শুরু থেকেই তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছিল, যার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে বিকল্প পথের ঘোষণা একটি জটিল কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সমাধান হিসেবে এসেছে। এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে, এটি ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিতে বিকল্প পথ প্রয়োগ বাস্তবায়িত হলে, জাহাজগুলোকে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেবে। তবে প্রণালিতে থাকা মাইন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনও রয়েছে, যা জাহাজ ও ক্রুদের জন্য সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিকল্প পথের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং সরবরাহের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পরবর্তীতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের এই সাময়িক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তাই বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রণালির বর্তমান অবস্থার ওপর নজর রাখছে।