প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি ও উন্নয়ন সাফল্যের গল্পের মধ্যেই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সংকট সাময়িক নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার ফল।
ঢাকায় আয়োজিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, গত তিন বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধির হারগুলোর একটি। প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির এই ধীরগতির পেছনে বড় কারণ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। ব্যবসা পরিবেশের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা কিংবা বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণে গতি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের ওপর। নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৫ শতাংশ থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং সঞ্চয় করার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়।
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—ব্যাংকিং ব্যবস্থা—এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধনের ঘাটতি এবং তারল্য সংকট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে দুর্বল করে তুলেছে। এর ফলে ঋণ বিতরণে সতর্কতা বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন পাওয়া কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, কারণ এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যায়।
রাজস্ব আহরণেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ার ফলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং ব্যাংক খাত পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় হ্রাস এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দারিদ্র্যের চিত্রও উদ্বেগজনকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পতিত হতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সবকিছুর মাঝেও আশার আলো দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করছেন, সময়োপযোগী এবং সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতি, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর সংস্কার এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসা পরিবেশ সহজ করা, নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাও প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে। এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে সাহসী ও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে সক্রিয় করা গেলে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।