ফ্ল্যাট নিবন্ধন খরচ কমাতে জোর দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০ বার
ফ্ল্যাট-প্লট নিবন্ধনের খরচ

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আবাসন খাতে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যার দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট ও প্লট কেনা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে উচ্চ নিবন্ধন খরচ। এই প্রেক্ষাপটে ফ্ল্যাট ও প্লট নিবন্ধনের মোট ব্যয় সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, বর্তমান উচ্চ ব্যয় শুধু ক্রেতাদের জন্যই বোঝা নয়, বরং এটি দেশের আবাসন খাতের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

রাজধানীর শেরেবাংলানগরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এই দাবি তুলে ধরা হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে আবাসন খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে একজন ক্রেতাকে ফ্ল্যাট বা প্লট নিবন্ধনের জন্য প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত খরচ বহন করতে হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি। এই উচ্চ ব্যয় অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকে বাজার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, ফলে আবাসন খাতে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।

রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, নিবন্ধন খরচ কমানো এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, এই খরচ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতাদের ওপর চাপ কমবে এবং নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়বে। এর ফলে সরকারও বেশি রাজস্ব পাবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে স্ট্যাম্প ডিউটি, স্থানীয় সরকার ফি, গেইন ট্যাক্সসহ বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় ধার্য আছে, তা সম্মিলিতভাবে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হলে আবাসন খাতে নতুন গতি ফিরে আসতে পারে।

আলোচনায় রিহ্যাব বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে। তারা স্ট্যাম্প ডিউটি ১.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে আনার কথা বলেছে। একইভাবে স্থানীয় সরকার ফি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গেইন ট্যাক্স, যা এলাকাভেদে ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, সেটি কমিয়ে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটের আকার নির্বিশেষে ভ্যাট হার ২ শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে বড় বা ছোট ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে কর কাঠামো সহজ ও সমতাভিত্তিক হয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ) জমি বা প্লট নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ফি ও নিবন্ধন ফি মিলিয়ে মোট ব্যয় ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। তারা আরও উল্লেখ করে, বর্তমান উৎস কর নির্ধারণের পদ্ধতি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকৃত দলিল মূল্যের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর নির্ধারণ করলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি কমবে।

এই আলোচনায় অন্যান্য খাতের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন এবং নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তবে আবাসন খাতের প্রস্তাবগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়, কারণ এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। একটি দেশের উন্নয়নে আবাসন খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নির্মাণ শিল্পের প্রসার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ নিবন্ধন খরচের কারণে অনেক লেনদেন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, যা সরকারের রাজস্ব আয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি খরচ কমানো যায়, তাহলে মানুষ স্বেচ্ছায় নিবন্ধনের পথে আসবে এবং এতে রাজস্ব আয়ও বাড়বে। এটি একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে ক্রেতা, ব্যবসায়ী এবং সরকার—সব পক্ষই লাভবান হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় আবাসন খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—সব মিলিয়ে এই খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যদি উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও, প্রাক-বাজেট আলোচনায় উত্থাপিত এসব প্রস্তাব আগামী বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন সহজলভ্য করতে হলে এই ধরনের নীতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ফ্ল্যাট ও প্লট নিবন্ধনের খরচ কমানোর দাবি শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়, বরং এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন বাজার গড়ে তুলতে হলে নিবন্ধন খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে যেমন সাধারণ মানুষের আবাসন স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ হবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চারিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত