প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ রান্নাঘর থেকে শুরু করে শহুরে পুষ্টিসচেতন খাদ্যতালিকা—সবখানেই শজনে একটি পরিচিত নাম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি নাম বারবার উঠে আসছে, সেটি হলো লাজনা। দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় অনেকেই শজনে ভেবে লাজনা কিনে ফেলছেন বা খাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ভাবছেন, দুটো একই গাছের আলাদা নাম মাত্র। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। শজনে ও লাজনা—এই দুই উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য, যা জানলে বিভ্রান্তি সহজেই দূর করা সম্ভব।
উদ্ভিদবিদদের মতে, শজনে, যা অনেক জায়গায় মরিঙ্গা বা শজিনা নামেও পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দেশে একটি জনপ্রিয় সবজি ও ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে লাজনা তুলনামূলক নতুন এক জাত, যাকে অনেক সময় উন্নত বা আধুনিক প্রজাতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তবে উন্নত বলেই যে এটি সব দিক থেকে শজনের চেয়ে ভালো, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং গঠন, স্বাদ, ফলন ও চাষাবাদের ধরনে এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে।
প্রথমেই যদি গাছের গঠন নিয়ে কথা বলা হয়, তাহলে পার্থক্যটি চোখে পড়ার মতো। দেশি শজনেগাছ সাধারণত অনেক লম্বা হয়ে থাকে। এটি ১০ থেকে ১২ মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এর ডালপালা ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি বড় আকারের বৃক্ষে পরিণত হয়। ফলে এর ফল সংগ্রহ করা অনেক সময় শ্রমসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে লাজনা গাছ তুলনামূলকভাবে খাটো এবং ঝোপালো প্রকৃতির। সাধারণত ৪ থেকে ৬ মিটার উচ্চতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা চাষি ও ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক। গাছের উচ্চতা কম হওয়ায় সহজেই ডাঁটা সংগ্রহ করা যায়, যা বাণিজ্যিক চাষে একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
কাণ্ড ও ডালপালার ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। শজনের কাণ্ড শক্ত ও কাষ্ঠল প্রকৃতির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও শক্ত হয়ে ওঠে এবং একটি স্থায়ী গাছের রূপ নেয়। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ডাল কেটে মাটিতে পুঁতলেই নতুন গাছ জন্মানো যায়, ফলে চাষাবাদ তুলনামূলক সহজ। অন্যদিকে লাজনার কাণ্ড তুলনামূলক নরম এবং কিছুটা মোটা। এটি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও শজনের মতো শক্ত কাঠামো তৈরি করতে পারে না। লাজনা সাধারণত বীজের মাধ্যমে চাষ করা হয়, যদিও ডাল থেকেও এর বিস্তার সম্ভব।
ফুল ও ফলনের সময়ের দিক থেকে এই দুই উদ্ভিদের পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। শজনে একটি মৌসুমি গাছ। বছরে একবার, সাধারণত বসন্তের শেষে এটি ফুল ও ফল ধারণ করে। এ সময় গাছের পাতা অনেকাংশে ঝরে যায় এবং প্রায় পাতাহীন অবস্থাতেই ডাঁটা দেখা যায়। অন্যদিকে লাজনা বারোমাসি প্রকৃতির। বছরের বিভিন্ন সময়েই এতে ফুল ও ফল পাওয়া যায়, যা কৃষকদের জন্য একটি বড় সুবিধা। বিশেষজ্ঞরা জানান, লাজনা গাছে রোপণের মাত্র ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই ফল আসতে শুরু করে, যেখানে শজনের ক্ষেত্রে প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়।
ফুলের গঠন ও রঙেও পার্থক্য রয়েছে। শজনের ফুল সাধারণত সাদা বা হালকা রঙের হয়ে থাকে, আর লাজনার ফুল কিছুটা গাঢ় ঘিয়ের মতো রঙের এবং এতে লালচে দাগ দেখা যায়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো লক্ষ্য করলে সহজেই গাছ দুটি আলাদা করা যায়।
ডাঁটার আকার ও স্বাদও ভিন্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শজনের ডাঁটা সাধারণত লম্বা, সরু এবং সোজা হয়। এটি এক ফুট বা তারও বেশি লম্বা হতে পারে এবং আঁশযুক্ত হলেও স্বাদে অত্যন্ত সুস্বাদু। অন্যদিকে লাজনার ডাঁটা তুলনামূলকভাবে ছোট, মোটা এবং কিছুটা বাঁকা। এর রঙ ধূসর-সবুজ এবং বাইরের অংশ কিছুটা শক্ত হলেও ভেতরে নরম। স্বাদের ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, লাজনা শজনের মতো সুস্বাদু নয়, কখনো কখনো হালকা তেতো ভাবও থাকতে পারে।
তবে পুষ্টিগুণের ক্ষেত্রে এই দুই উদ্ভিদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। শজনে ও লাজনা উভয়ই ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, হজমশক্তি উন্নত করতে এবং শরীরের নানা ঘাটতি পূরণে এই দুটি উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বসন্তকালীন নানা রোগ প্রতিরোধেও এগুলোর ব্যবহার প্রচলিত।
বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শজনে ও লাজনার চাহিদাও বাড়ছে। অনেকেই সুপারফুড হিসেবে এগুলোকে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করছেন। তবে সঠিকভাবে না চিনে খেলে প্রত্যাশিত স্বাদ বা অভিজ্ঞতা নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই বাজার থেকে কেনার সময় গাছের গঠন, ডাঁটার আকার এবং রঙ লক্ষ্য করলে সহজেই পার্থক্য বোঝা সম্ভব।
সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, শজনে ও লাজনা দেখতে কাছাকাছি হলেও তারা এক নয়। প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো জানা থাকলে বিভ্রান্তি দূর হবে, পাশাপাশি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে। সাধারণ মানুষের জন্য যেমন এটি একটি দৈনন্দিন জীবনের জ্ঞান, তেমনি কৃষকদের জন্য এটি উৎপাদন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।