পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাড়ছে প্রাণহানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৬ বার
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাড়ছে প্রাণহানি

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এই নৌরুট ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে নানা অভিযোগ। গত এক দশকে একাধিক দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা এই নৌরুটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ বছরে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ছোট-বড় অন্তত ১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চারটি বড় দুর্ঘটনায় ১০৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে বারবার উঠে এসেছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পুরোনো পল্টুন, অনিরাপদ ঘাট এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের বিষয়টি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটের প্রবেশপথ অত্যন্ত খাড়া এবং অনেক জায়গায় উঁচু-নিচু হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ভারী যানবাহন যেমন বাস ও ট্রাক ফেরিতে ওঠা-নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। নিয়মিত এই রুট ব্যবহারকারী যাত্রী আশরাফুল আলম সবুজ জানান, নৌপথের চেয়ে ঘাটের অবস্থাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, ফেরিতে ওঠা ও নামার সময় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। তিনি অভিযোগ করেন, বহু বছর ধরে একই সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান নেওয়া হয়নি।

আরেক যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত টোল নেওয়া হলেও ঘাটে কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। বয়স্ক মানুষদের জন্য ফেরিতে ওঠানামা করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করতেও মানুষ দ্বিধায় পড়েন।

এই নৌরুট ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী কাজল জানান, ঢাকায় পণ্য পরিবহনের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লোড-আনলোডের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি বলেন, অনেক সময় ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান নদীতে পড়ে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এসব সমস্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সম্প্রতি পাটুরিয়া ঘাটে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য মনজুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। বাসটিতে প্রায় ৫৫ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। তার মতে, ঘাটের ঢালু রাস্তা এবং জরাজীর্ণ পল্টুন এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের দুর্ঘটনার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতীতেও একাধিক বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় ‘এমভি মোস্তফা-৩’ নামের একটি লঞ্চ ডুবে যায়, যেখানে বহু যাত্রী প্রাণ হারান। ২০২১ সালে পুরোনো একটি ফেরি ডুবে গিয়ে যানবাহনের ক্ষতি হয়। ২০২৪ সালে ঘন কুয়াশার মধ্যে আরেকটি ফেরি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ইঙ্গিত দেয় যে দীর্ঘদিন ধরেই এই নৌরুটে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ জানিয়েছেন, ঘাটগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হবে। তার মতে, নিরাপদ ও আধুনিক ঘাট নির্মাণ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবকাঠামোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীভাঙন ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব আহসান জানিয়েছেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটকে স্থায়ী ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতির জন্য এই নৌরুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে এই পথের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়তে পারে।

নৌপথ সংশ্লিষ্ট গবেষকরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিক ফেরিঘাট নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি চালক ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং বহু পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজন হারানোর বেদনা, আর্থিক ক্ষতি এবং নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পিত উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মানুষের জীবন রক্ষাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ যাত্রীদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত