হামের প্রাদুর্ভাব কমবে এক মাসে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
হামের প্রাদুর্ভাব কমবে এক মাসে

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা, একই সঙ্গে দুঃখজনকভাবে মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা যেমন দ্রুত বেড়েছে, তেমনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টিকা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে আগামী এক মাসের মধ্যেই নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১০ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ১৭৭ জন শিশু এবং নতুন করে ১৬৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। এই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪০৯ জনে। পাশাপাশি সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে আট হাজার ৯১০ জনে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ছয় হাজার ৬০৯ জন শিশু।

চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা মূলত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসার কারণে বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং বড় শহরগুলোতে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। পরিবারের একাধিক শিশু একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা সংক্রমণের দ্রুত বিস্তারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ৫ এপ্রিল থেকে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এছাড়া আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকা কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তীতে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আগে টিকা নেওয়া থাকলেও ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পুনরায় টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে জ্বর বা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় থাকা শিশুদের টিকা দেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নির্দেশনা অনুসরণ করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকার কার্যকারিতা শরীরে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সাধারণত ১৫ দিন থেকে এক মাস সময় নেয়। এই সময়ের মধ্যেই শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি ধীরে ধীরে কমে আসে। ফলে চলমান টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হামের কারণে মৃত্যুর হার কমাতে হলে শুধু টিকা নয়, বরং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, আলাদা রাখা এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি। একজন বিশেষজ্ঞের মতে, টিকা শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সময় নেয়, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুহার কমাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন যে একটি মাত্র টিকা আংশিক সুরক্ষা দিলেও দুটি ডোজ সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে যে টিকাদান চলছে, সেটি মূলত প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করছে। আগামী জুন মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া গণটিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে হামের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছে। তাই আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখা বা আইসোলেশনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এদিকে নগরায়ন ও ঘনবসতির কারণে রাজধানী ঢাকা এখন উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং টিকাদান কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে হামের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হলে এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করবে, যা ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত