মহাকাশযাত্রার পর নভোচারীদের দেহে আশ্চর্য পরিবর্তন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
মহাকাশযাত্রার পর নভোচারীদের দেহে আশ্চর্য পরিবর্তন

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে ঐতিহাসিক ১০ দিনের চন্দ্রাভিযান শেষে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে, দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ এই মহাকাশ অভিযানের পর তারা সবাই সুস্থ আছেন। তবে মহাকাশ থেকে ফিরে আসার পর নভোচারীদের শরীরে ও মনে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়ে আবারও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে শক্তিশালী এসএলএস রকেটে চেপে মহাকাশে যাত্রা শুরু করে আর্টেমিস-২ মিশন। প্রায় ১০ দিন চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে অবশেষে ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে প্যারাশুটের মাধ্যমে নিরাপদে অবতরণ করে। দীর্ঘ এই যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াকে আধুনিক মহাকাশ গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাসা জানিয়েছে, চারজন নভোচারীই আপাতত সুস্থ রয়েছেন এবং তাদের প্রাথমিক শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক। তবে মহাকাশ থেকে ফিরে আসার পর শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে বিশ্লেষণ করা হবে। সংস্থাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো মেডিকেল রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সংক্ষিপ্ত মিশনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

মহাকাশ গবেষকদের মতে, পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে গেলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির পরিবেশে। পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ সবকিছুকে স্থিরভাবে ধরে রাখে, কিন্তু মহাকাশে এই শক্তি প্রায় অনুপস্থিত থাকে। এই শূন্য বা মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশই নভোচারীদের শরীরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে অবস্থানের সময় মানুষের শরীর ধীরে ধীরে ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যায়। ফলে পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে। বিশেষ করে পিঠ, ঘাড় এবং পায়ের পেশিতে এই প্রভাব বেশি দেখা যায়। পৃথিবীতে ফিরে আসার পর অনেক নভোচারী প্রথম দিকে হাঁটতে কষ্ট অনুভব করেন এবং ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হয়। মাথা ঘোরা বা অস্থিরতা অনুভব করাও একটি সাধারণ ঘটনা।

শুধু পেশি ও হাড় নয়, মহাকাশ ভ্রমণের ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তরল বণ্টনেও পরিবর্তন ঘটে। শূন্য মাধ্যাকর্ষণে রক্ত ও অন্যান্য তরল শরীরের উপরের অংশে বেশি জমে যায়, যার কারণে মুখ ফুলে যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার পর শরীর সেই ভারসাম্য পুনরায় ঠিক করতে সময় নেয়, ফলে সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি বা একাগ্রতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

চোখের বলের গঠনেও সাময়িক পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। কিছু নভোচারীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি সামান্য কমে যাওয়া বা ঝাপসা দেখা যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঘ্রাণশক্তি ও স্বাদের অনুভূতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতাও মহাকাশ পরিবেশে কিছুটা পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে হৃদপিণ্ডকে তুলনামূলক কম কাজ করতে হয়, ফলে পৃথিবীতে ফিরে এসে এটি আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে কিছুটা সময় নেয়। একই সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থাও সাময়িকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মহাকাশের বিকিরণ বা রেডিয়েশন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আমাদের এই বিকিরণ থেকে রক্ষা করে, কিন্তু মহাকাশে সেই সুরক্ষা অনেক কমে যায়। দীর্ঘ সময়ের অভিযানে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশনের কারণে কোষের ক্ষতি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। তবে আর্টেমিস-২ এর মতো স্বল্পমেয়াদি মিশনে এই ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

ত্বকের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। অনেক নভোচারীর ক্ষেত্রে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া বা সামান্য র‍্যাশ দেখা দেওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। রক্তে শ্বেতকণিকার পরিমাণেও পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করে।

তবে এই সব পরিবর্তনের পাশাপাশি মহাকাশ ভ্রমণের একটি আশ্চর্যজনক দিকও রয়েছে, যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, উচ্চগতিতে চলা এবং কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে সময় পৃথিবীর তুলনায় কিছুটা ধীরে চলে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, মহাকাশ থেকে ফিরে আসা একজন নভোচারী পৃথিবীতে থাকা সমবয়সীদের তুলনায় সামান্য কম বয়সী থাকতে পারেন। যদিও এই পার্থক্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং সাধারণভাবে অনুভবযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্টেমিস-২ মিশনের মতো স্বল্পমেয়াদি অভিযানে এসব পরিবর্তন সাধারণত অস্থায়ী হয়। শরীর ধীরে ধীরে পৃথিবীর পরিবেশে ফিরে আসে এবং কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে বেশিরভাগ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাওয়া যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ মিশনের ক্ষেত্রে নিয়মিত শারীরিক পর্যবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নাসা ও অন্যান্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের পরিকল্পনায় এসব শারীরিক পরিবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ ভ্রমণ মানবদেহের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা পুরোপুরি বোঝা এখনও গবেষণার একটি চলমান ক্ষেত্র।

সব মিলিয়ে আর্টেমিস-২ মিশন শুধু একটি সফল চন্দ্রাভিযানই নয়, বরং মানবদেহ কীভাবে মহাকাশের চরম পরিবেশে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেই গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন তথ্য যোগ করেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানগুলো আরও নিরাপদ ও মানববান্ধব করতে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত