ডিজিটাল রূপান্তরেই দুর্নীতি দমনের পথ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৪ বার
ডিজিটাল রূপান্তরেই দুর্নীতি দমনের পথ

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক কাঠামোয় নিয়ে যেতে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই—এমনই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত নাগরিক সেবা কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে দুর্নীতির অনেক ক্ষেত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকুচিত হয়ে আসবে এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক-এর ডিজিটাল অ্যাপ ‘ইউসিবি ওয়ান’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের সামনে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সংস্কার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড” এবং “ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট” বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাগরিকদের আর্থিক লেনদেন, সরকারি সেবা গ্রহণ এবং পরিচয় ব্যবস্থাপনা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে, যা দুর্নীতির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে।

তিনি আরও বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিককে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি করে ব্যাংক হিসাব নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে একটি বৃহৎ জনসংখ্যার দেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে যদি শতকোটি মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশে তা অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য।

অনুষ্ঠানে তিনি দেশের ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সংকট ও সীমাবদ্ধতার বিষয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অসংগতি এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সংস্কৃতির কারণে ব্যাংকিং খাত একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকৃত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দেওয়া উচিত হলেও অনেক ব্যাংক এই সীমা অতিক্রম করে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করছে। এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করছে। ইসলামী ব্যাংকিং খাতেও একই ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার সমস্যা, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি মৌলিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত। তিনি বলেন, এই ধরনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্য অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করে এবং বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে। একইসঙ্গে দেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও সীমিত হয়ে আছে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ও জটিল চার্জ কমাতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরে পায় এবং ব্যাংকমুখী হয়। একইসঙ্গে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিতে হবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তার বক্তব্যে অর্থনীতির বৃহত্তর চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণ অল্প কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে আসা এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাওয়াকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে যুব দারিদ্র্য এবং নারীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাওয়াকে তিনি অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, দেশের শিল্পখাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাবও দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। ফলে বর্তমান সরকারকে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার সবসময় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিচ্ছে এবং বিনিয়ন্ত্রণীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি কার্যকর অর্থনীতির জন্য বাজারকে তার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে বর্তমানে বাজার কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করছে না এবং এর পেছনে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা একটি বড় কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডিজিটালাইজেশনের প্রসঙ্গে ফিরে এসে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে আনা সম্ভব। ডিজিটাল লেনদেন, স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণ ব্যবস্থা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং জনগণের ভোগান্তি হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর ইতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। ‘ইউসিবি ওয়ান’ অ্যাপের উদ্বোধনকে তারা ব্যাংকিং খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।

শেষ পর্যন্ত রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে। তার মতে, এই যাত্রাপথে ডিজিটালাইজেশন হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি, যা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতিটি স্তরকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত