মধ্যপ্রাচ্য সংকটে শাহজালালে ফ্লাইট বিপর্যয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫০ বার
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে শাহজালালে ফ্লাইট বিপর্যয়

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬০টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং কার্গো পরিবহন কার্যত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি দেশের বিমান চলাচল খাতের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের আকাশসীমা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান—এই দেশগুলোর আকাশপথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে এই অঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ কার্যত ব্যাহত হয়ে পড়ে।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত প্রথম ধাক্কায় ৩৩৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এরপর ১০ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত আরও ২৭৫টি ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার আশা দেখা দিলেও ২০ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আরও ২২৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। একইভাবে ৩০ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাতিল হয় ১৬০টি ফ্লাইট এবং সর্বশেষ ৯ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত বাতিল হয়েছে আরও ৬০টি ফ্লাইট। সব মিলিয়ে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০, যা দেশের বিমান চলাচল ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যত্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রী, বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীরা। যারা কর্মস্থলে ফেরার জন্য নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারেননি, তারা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। অনেকেই ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন, আবার কেউ কেউ চাকরি হারানোর আশঙ্কাও করছেন। বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর শুনে অসহায়ভাবে ফিরে যেতে হয়েছে অনেক যাত্রীকে। তাদের চোখেমুখে ছিল হতাশা, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার ছাপ।

একইসঙ্গে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও কার্গো পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনে এই রুটগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফ্লাইট বাতিলের কারণে এসব পণ্য সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না, ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বিমান চলাচল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শুধু সরাসরি ফ্লাইটই নয়, বিকল্প রুট ব্যবহার করেও ফ্লাইট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং দীর্ঘতর পথ ব্যবহারের কারণে খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা অনেক এয়ারলাইনসের জন্য কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন করে তুলছে। ফলে তারা সাময়িকভাবে ফ্লাইট বাতিল করাকেই নিরাপদ ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আংশিক উন্নতির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু দেশের আকাশসীমা সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর ফলে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি এবং পরিস্থিতি যে কোনো সময় আবারও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। যাত্রীদের সর্বশেষ তথ্য জানাতে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এয়ারলাইনসগুলোকেও নিয়মিত আপডেট দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যতক্ষণ না পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়।

এই সংকট দেশের অর্থনীতি ও প্রবাসী নির্ভর খাতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যান এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। ফ্লাইট সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী পাঠানো এবং পুরনো কর্মীদের যাতায়াত ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে। একটি অঞ্চলের সংঘাত দ্রুতই অন্য অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ বাংলাদেশ। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প রুট পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। হাজারো যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী এই সংকটের সরাসরি ভুক্তভোগী। তবে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে এবং খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ততদিন পর্যন্ত যাত্রীদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত