মাইলস্টোনে নিহত সন্তানেরা শহিদ , বাবা-মার ধৈর্যের পরীক্ষা ও আল্লাহর নিকট নেক আমলে ফিরে আসার আহ্বান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৮ বার

প্রকাশ: ২৫শে জুন ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই নানা দুর্ঘটনায় তরতাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে। কিছু মৃত্যু এমনভাবে জাতিকে নাড়া দিয়ে যায় যে, তা কেবল শোকের নয়, চেতনারও উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানীর মিরপুরের মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক মৃত্যু এমনই এক ঘটনা — যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এ মৃত্যু কেবল নিছক এক দুর্ঘটনা নয়; এটি অসংখ্য মা-বাবার হৃদয়ে স্থায়ী ক্ষতের জন্ম দিয়েছে, যারা তাঁদের নিষ্পাপ সন্তানদের কফিনে মুড়ে দাফন করেছেন ঈমান, কান্না আর বিশ্বাসের আলোকে।

এই লেখার মূল লক্ষ্য শুধু সেই শোক প্রকাশ নয়, বরং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝার চেষ্টা — এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধারণ করবেন এবং জীবনকে আরও নেক আমলের পথে ফিরিয়ে আনবেন।

শহিদ সন্তানেরা: একটি কোরআনভিত্তিক উপলব্ধি

পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে বারবার বলা হয়েছে, যারা অন্যায়ভাবে, অল্প বয়সে বা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে, বিশেষত যাদের কোনো গুনাহ করার সময়ই হয়নি, তাদের মৃত্যু শহিদের মর্যাদা পায়। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করো না।”
সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৪

এই আয়াতে আমরা দেখতে পাই, মৃত্যুকে ইসলামে কেবল এক অন্তিম বিরতি নয় বরং আল্লাহর নিকট পৌঁছার এক উত্তম মাধ্যম হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মাইলস্টোনের নিহত ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত ছিলেন না। তারা ছিল বিদ্যার্জনে নিয়োজিত, পরিবারের ভালোবাসার আধার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাদের মৃত্যু আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরীক্ষার মতো, যা এ দেশের হাজারো পরিবারের হৃদয়কে ব্যথিত করেছে। তবে তাদের এই মৃত্যু শহিদের মর্যাদা লাভের উপযুক্ত বলেই প্রতীয়মান।

ধৈর্য ও সওয়াব: মা-বাবার জন্য এক মহান পরীক্ষার মুহূর্ত

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও প্রাণ এবং ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন।” সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৫

যখন কোনো মা বা বাবা সন্তানের লাশ কাঁধে করে দাফন করে আসে, তখন তা কেবল মানবীয় নয়; তা এক ঈমানের উচ্চপর্যায়ের পরীক্ষা। ইসলাম এমন কঠিন মুহূর্তে ধৈর্যধারণ ও আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজেও তার সন্তানদের হারিয়েছেন, কিন্তু কোনো মুহূর্তে আল্লাহর প্রতি অভিযোগ জানাননি, বরং বলেন, “চোখ কাঁদছে, হৃদয় ব্যথিত, তবুও মুখ দিয়ে এমন কিছু বলব না, যা আমার রব অসন্তুষ্ট হয়।”

এমন বিপদের সময় ইসলামের নির্দেশনা হলো— “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পাঠ করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর কাছে সাওয়াব কামনা করা। সেই বাবা-মায়েরা যারা এই কষ্টের মাঝেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন, তারা জান্নাতে তাদের সন্তানদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আশ্বাসও পেয়েছেন।

নেক আমলের দিকে ফিরে আসার সময়

এ মৃত্যু আমাদের সামষ্টিক জীবনের প্রতিও প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত মৃত্যু গ্রহণ করার মতো? মৃত্যু যখন শিশুদের গায়ে ছুঁয়ে যায়, তখন বড়দের জন্য তা হয় কঠিনতম বার্তা — ‘ফিরে এসো তোমার প্রভুর দিকে’। এইসব মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের মূল উদ্দেশ্য ভোগ নয় বরং আল্লাহর ইবাদত।

আজ যারা নিহত হয়েছেন, তারা তো নিষ্পাপ। কিন্তু যারা বেঁচে আছি, তারা কি প্রস্তুত? আমরা কি আমাদের কর্মপদ্ধতি, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধে সচেতন?

সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে, প্রয়োজন আজ ঘরে ঘরে নেক আমলের উদ্যোগ। সৎকাজে পরিবার গঠন, সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, এবং আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ — এটাই এমন মৃত্যুদের যথাযথ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

মাইলস্টোনের নিহত ছাত্রছাত্রীরা চলে গেছে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া শূন্যতা আর জেগে ওঠা আত্মিক প্রশ্ন রয়ে গেছে আমাদের সামনে। ইসলাম আমাদের শোককে ধৈর্যে রূপান্তর করতে শেখায়, আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে আল্লাহর পথে ত্যাগ হিসেবে মান্য করে। এই ঘটনায় আমরা শোকাহত, কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের ঈমান ও আমলের প্রতি নতুনভাবে মনোযোগী হওয়ার তাগিদও দিচ্ছে।

আল্লাহ তাদেরকে শহিদের মর্যাদা দিন, তাদের পরিবারকে অসীম ধৈর্য ও প্রতিদান দান করুন, এবং আমাদের সবাইকে মৃত্যু ও জীবনের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করার তাওফিক দিন। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত