নিজ হাতে নির্মিত পতনের পথে ইরান ? Geopolitics, দ্বিচারিতা ও ভুল চুক্তির মারপ্যাঁচে বিপন্ন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫
  • ২০৩ বার

প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের পরিস্থিতি এক গভীর আত্মবিশ্লেষণের দাবি রাখে। ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—সবই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কি শুধুই ভুক্তভোগী, নাকি সে নিজেই ধীরে ধীরে নিজের পতনের পথ প্রশস্ত করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক পেছনে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যারা ইরানের শাসনক্ষমতায় আসেন, তাদের সামনে ছিল এক ঐতিহাসিক সুযোগ—জাতিকে আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী করে তোলা। কিন্তু তারা কি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন? নাকি কৌশলগত ভুল ও দ্বিচারিতার জালে আজ নিজেদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করেছেন?

বিপ্লবের পর থেকেই ইরান ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার শিকার। তথাকথিত ‘বিরোধিতা’র বুলি আওড়ালেও বাস্তবে এই শাসকগোষ্ঠী বহুবার পশ্চিমাদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতায় গিয়েছেন। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, চীনের টেলিকম জায়ান্ট হুয়াওয়ে ও ZTE—যারা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়েও ইরানের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। এ সহযোগিতা ছিল ইরানের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অথচ ২০১৬ সালে যখন পারমাণবিক চুক্তি হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানই তথ্য সরবরাহ করে, কোন কোন চীনা কোম্পানি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাদের সঙ্গে কাজ করেছে। এর ফলাফল—হুয়াওয়ের ওপর বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা এবং চীনের সাথে সম্পর্কের ফাটল।

ইরান একদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চায়, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে প্রবেশ করে। এই চুক্তির কথা বিশ্বমাধ্যমে প্রচারিত হলে তেহরান আশায় বুক বাঁধে—ওয়াশিংটন হয়তো চাপ কমাবে। কিছু অনিশ্চিত আশ্বাস পাওয়ার পর ইরান ‘অফ দ্য রেকর্ড’ চীনা প্রকল্পগুলোতে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে। নিরাপত্তাজনিত অজুহাতে চীনা প্রকৌশলী ও বিনিয়োগকারীদের কাজে বাধা দেয় আইআরজিসি। এর ফলে চীন ও ইরানের সম্পর্কের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।

ইরানের ভেতরে এখন প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিপ্লবী গার্ডের নামে পরিচালিত সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্ব্যবস্থা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে এক গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার যেভাবে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দমন করেছে, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিন্দার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনীতি এখন ধসে পড়েছে। ইরানের তরুণ সমাজ, যারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে চায়, তারা মনে করে এই সরকার তাদের ভবিষ্যতের প্রধান বাধা।

এই বিপর্যয়ের মুখে ইরান কি পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে, এখন ইরানের উচিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সময়সীমাবদ্ধ পারমাণবিক চুক্তি করা—যেখানে তারা ১০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও বোমা তৈরির কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে দেশটি চীনের সঙ্গে মিলে সামরিক ও সাইবার নেটওয়ার্ক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারবে।

পাকিস্তানের সঙ্গে মিত্রতা বাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং ভারতকে কৌশলগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। তবে এজন্য চাই সুসংগঠিত নেতৃত্ব, পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ়তা, এবং জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য বাস্তব সংস্কার।

ইরান এক সময় ইসলামী বিশ্বের রোল মডেল হতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন নিজেদের কৌশলগত ভুল, পরস্পরবিরোধী নীতি, এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে তারা অস্তিত্বের সংকটে পড়ে গেছে। যে জাতি একসময় যুগান্তকারী সভ্যতার জনক ছিল, সেই জাতি আজ ধ্বংসের কিনারায়।

এই পতনের জন্য বাইরের শক্তি যতটা দায়ী, ভেতরের অদূরদর্শিতা তার চেয়ে বেশি। এখনো সময় আছে—জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে যদি সঠিক পথ বেছে নেয়, তবে ইরান পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা কি সেই সাহস দেখাতে পারবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত