ডিজিটাল অসতর্কতায় ফাঁস হচ্ছে ফোন নম্বর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৫৮ বার
ডিজিটাল অসতর্কতায় ফাঁস হচ্ছে ফোন নম্বর

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অচেনা নম্বর থেকে হঠাৎ ফোন, লটারি জেতার প্রলোভন, কম সুদে ঋণের প্রস্তাব কিংবা ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা—এ ধরনের ঘটনা এখন অনেক মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব ফোন নম্বর কেবল পরিবার বা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছে থাকার কথা, সেগুলোও কীভাবে স্ক্যামারদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে—এই প্রশ্ন ক্রমেই সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে ব্যবহারকারীর অজান্তেই তৈরি হচ্ছে বিশাল তথ্যভান্ডার, যেখানে ব্যক্তিগত ফোন নম্বরসহ নানা সংবেদনশীল তথ্য জমা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তা বিভিন্নভাবে প্রতারকচক্রের হাতে চলে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় মানুষ বিভিন্ন অ্যাপ ডাউনলোড করে থাকেন—গেম, ফটো এডিটর, ভিডিও এডিটিং টুল কিংবা ইউটিলিটি অ্যাপ। এসব অ্যাপ ইনস্টল করার সময় অধিকাংশ ব্যবহারকারী অনুমতির শর্ত না পড়েই দ্রুত ‘অ্যালাউ’ বাটনে চাপ দেন। এর ফলে অনেক অ্যাপ ব্যবহারকারীর কন্টাক্ট লিস্ট, মেসেজ, এমনকি কল লগ পর্যন্ত অ্যাক্সেস পেয়ে যায়। এরপর এসব তথ্য ব্যবহারকারীর অজান্তেই সার্ভারে পাঠানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো “ডেটা এক্সপোজার চেইন”, যেখানে একজন ব্যবহারকারীর ফোন নম্বর শুধু তার নিজের ডিভাইস থেকেই নয়, বরং তার পরিচিত কারো ডিভাইস থেকেও ফাঁস হতে পারে। অর্থাৎ আপনার নম্বর যদি কারও ফোনে সংরক্ষিত থাকে এবং সেই ব্যক্তি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ ব্যবহার করেন, তাহলে আপনার তথ্যও সেই ডেটাবেইসে চলে যেতে পারে।

অচেনা কল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কলার আইডি অ্যাপ নিয়েও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এসব অ্যাপ অনেক সময় ব্যবহারকারীর পুরো কন্টাক্ট লিস্ট সংগ্রহ করে একটি বৃহৎ ডেটাবেইস তৈরি করে, যা পরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি হতে পারে। এই ডেটা থেকেই পরবর্তীতে স্ক্যামাররা সক্রিয় ও ব্যবহারযোগ্য নম্বর সংগ্রহ করে প্রতারণার জন্য ব্যবহার করে।

সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ই-কমার্স সাইট, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, টেলিকম কোম্পানি এবং রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের ডেটাবেইস হ্যাক হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এসব ঘটনায় কোটি কোটি ব্যবহারকারীর নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে এসব তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করা হয়, যেখানে খুব কম দামে বিপুল সংখ্যক সক্রিয় ফোন নম্বর কিনে নেয় প্রতারকচক্র।

এরপর সেই তথ্য ব্যবহার করে চালানো হয় ফিশিং কল, ভুয়া লটারি বার্তা, ব্যাংকিং প্রতারণা এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন জালিয়াতি। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা নিজেকে ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি বা সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তথ্য ও অর্থ হাতিয়ে নেয়।

শুধু অ্যাপ বা হ্যাকিং নয়, দৈনন্দিন জীবনের নানা পরিস্থিতিতেও ফোন নম্বর ফাঁস হচ্ছে। শপিং মল, সুপারশপ বা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অফার ও ডিসকাউন্টের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। অনেক সময় লটারি বা বিশেষ সুবিধার প্রলোভনে মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের নম্বর দিয়ে দেন। পরে এসব তথ্য মার্কেটিং কোম্পানির কাছে বিক্রি হয়, এবং সেখান থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে গিয়ে তা প্রতারকদের হাতে পৌঁছে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়াও এখন একটি বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে নিজের ফোন নম্বর পাবলিক করে রাখেন। স্ক্যামাররা স্বয়ংক্রিয় বট ব্যবহার করে এসব তথ্য সংগ্রহ করে, যাকে প্রযুক্তির ভাষায় “ডেটা স্ক্র্যাপিং” বলা হয়। একবার তথ্য সংগ্রহ হয়ে গেলে তা দিয়ে স্প্যাম কল, প্রতারণামূলক বার্তা এবং ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রযুক্তি নয়, বরং ব্যবহারকারীর অসচেতনতা। অনেকেই না জেনে বা না বুঝে নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার আগে সেটির অনুমতি এবং প্রাইভেসি নীতিমালা ভালোভাবে দেখা উচিত। অপ্রয়োজনীয় কন্টাক্ট বা মেসেজ অ্যাক্সেস বন্ধ রাখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফোন নম্বর গোপন রাখা, সন্দেহজনক ওয়েবসাইটে তথ্য না দেওয়া এবং টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোন, মেসেজ বা লিংকের প্রতি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন বা ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হলে তা যাচাই না করে কোনোভাবেই শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শতভাগ ডিজিটাল গোপনীয়তা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও সচেতনতা এবং নিরাপদ ব্যবহার অভ্যাস অনেক বড় ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। প্রযুক্তির এই যুগে নিরাপদ থাকা মানে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা নয়, বরং সঠিকভাবে তা ব্যবহার করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com