এক মাসে চারবার ভূমিকম্প, বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত নাকি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া?

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ৬৮ বার

চলতি মাসে বাংলাদেশে চার দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব কম্পন অনুভূত হওয়ার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে—ঘন ঘন ভূমিকম্প কি বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস, নাকি এটি ভূত্বকের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া?

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক মাসে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পৃথিবীর ভূত্বক সবসময়ই নড়াচড়ার মধ্যে থাকে। তবে কোনো অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে কম্পন অনুভূত হলে সেটি পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে এবং বিজ্ঞানীরা তখন সংশ্লিষ্ট ফল্টলাইন বা ভূতাত্ত্বিক গঠনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেন।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে কয়েকটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব রয়েছে। ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের পারস্পরিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এবং পার্বত্য অঞ্চলগুলোকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর অধিকাংশই ছিল মাঝারি বা নিম্নমাত্রার। এসব কম্পনের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও এগুলো আমাদের ভূমিকম্প প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প কখনো কখনো ভূগর্ভস্থ চাপের আংশিক মুক্তি ঘটায়। তবে শুধুমাত্র ঘন ঘন ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে বলেই বড় ভূমিকম্প আসবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বর্তমানে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি নেই, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।

তবে উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে দ্রুত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মাঝারি মাত্রার একটি ভূমিকম্পও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের তুলনায় প্রস্তুতির ঘাটতিই বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। অনেক ভবন এখনও ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্যোগকালীন করণীয় সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজবও ছড়িয়েছে। কেউ কেউ বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও বিজ্ঞানীরা এসব গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্কুল, কলেজ, অফিস এবং আবাসিক ভবনগুলোতে নিয়মিত মহড়া আয়োজন করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে, কোথায় অবস্থান করতে হবে এবং কীভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে—এসব বিষয়ে জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

এছাড়া নগর পরিকল্পনায় ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্প গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। কারণ দেশের আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্টলাইন রয়েছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। তবে কখন, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে—তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ভূমিকম্পকে ভয় নয়, বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা গেলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

সব মিলিয়ে, চলতি মাসে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও এটি বড় কোনো দুর্যোগের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়, তবুও সংশ্লিষ্টদের মতে এখনই প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়ানোর উপযুক্ত সময়।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com