ফিউশন প্রযুক্তিতে ৪১১ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ পেল প্রোক্সিমা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ফিউশন প্রযুক্তিতে ৪১১ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ পেল প্রোক্সিমা

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের জ্বালানি সংকটের সমাধানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ক্লিন এনার্জি বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ভবিষ্যৎ হিসেবে পরিচিত ‘ফিউশন শক্তি’ প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ পেয়েছে জার্মানির মিউনিখভিত্তিক স্টার্টআপ ‘প্রোক্সিমা ফিউশন’। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল এবং জার্মানির শীর্ষস্থানীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আরডব্লিউই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে এই স্টার্টআপটি ৪১১ মিলিয়ন ইউরো—যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫,৭৮৩ কোটি টাকা—তহবিল সংগ্রহ করেছে। এই বিনিয়োগের ফলে প্রোক্সিমা ফিউশনের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ইউরো, যা ইউরোপীয় প্রযুক্তি খাতের জন্য এক অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক সংকেত।

এই অর্থায়ন পর্বে নেতৃত্ব দিয়েছে এক্সটিএক্স ভেঞ্চারস এবং ইস্ট এক্স ভেঞ্চারস। বিনিয়োগের পাশাপাশি আরডব্লিউই কোম্পানিটি প্রোক্সিমা ফিউশনের সঙ্গে একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় জার্মানির বাভারিয়া অঙ্গরাজ্যের গুন্ডরেমিংগেন এলাকায় অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গায় বিশ্বের প্রথম স্টেলারেটর ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি একদিকে যেমন পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর যথাযথ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করবে, তেমনি ফিউশন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফিউশন শক্তিকে কেন আধুনিক বিজ্ঞানের ‘পবিত্র গ্রেইল’ বা আল্টিমেট সলিউশন বলা হয়, তার পেছনে রয়েছে এর অভাবনীয় কার্যকারিতা। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মূলত ‘ফিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যেখানে ভারী পরমাণুকে ভেঙে শক্তি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, ফিউশন প্রযুক্তি হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র তাদের বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে। এখানে দুটি হালকা পরমাণুকে তীব্র চাপে এবং তাপে একত্রিত করে শক্তি তৈরি করা হয়। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় গুণ হলো এতে কোনো ক্ষতিকারক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয় না এবং এটি কার্যত অসীম শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রোক্সিমা ফিউশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রান্সেসকো সিওর্তিনো এই বিনিয়োগের বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন যে, ইউরোপীয় প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার এক চূড়ান্ত প্রমাণ এই ঘটনা। তিনি মনে করেন, ইউরোপ কেবল নতুন আইডিয়া উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সেই আইডিয়াকে ভিত্তি করে বিশ্বমানের বাণিজ্যিক কোম্পানি গড়ে তুলতেও সক্ষম। গুগল ও আরডব্লিউই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের এই সরাসরি বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ফিউশন প্রযুক্তির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি স্টার্টআপের সাফল্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লড়াইয়ে এক শক্তিশালী পদক্ষেপ।

বিজ্ঞানীদের মতে, ফিউশন শক্তি যদি বাণিজ্যিকভাবে সফলভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে পৃথিবী থেকে জ্বালানি সংকট চিরতরে বিদায় নিতে পারে। এতে কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হবে না, থাকবে না দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ভয়ংকর ঝুঁকি। লেজার অথবা শক্তিশালী চুম্বকের সাহায্যে পরমাণুর এই মিলন ঘটানো বর্তমান বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, প্রোক্সিমা ফিউশন তাদের আধুনিক স্টেলারেটর ডিজাইনের মাধ্যমে এই জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। স্টেলারেটর এমন এক বিশেষ ব্যবস্থা, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে উত্তপ্ত প্লাজমাহ ধরে রাখা হয়, যা ফিউশন প্রক্রিয়ার প্রধান শর্ত।

এই বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর মাধ্যমে জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চলে পুনরায় এক নতুন শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গুন্ডরেমিংগেন এলাকায় যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একসময় পুরোনো পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করত, সেখানেই এখন তৈরি হতে যাচ্ছে আধুনিক ফিউশন প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি পুরোনো প্রযুক্তি থেকে নতুন প্রযুক্তিতে উত্তরণের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতের এই পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরতা পৃথিবী নামক গ্রহটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এমতাবস্থায় ফিউশন প্রযুক্তির মতো পরিচ্ছন্ন শক্তির উদ্ভাবন কেবল আধুনিক সভ্যতার জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি। প্রোক্সিমা ফিউশনের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে তরুণ গবেষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য এক দারুণ প্রেরণা। প্রযুক্তি ও পুঁজির এই মিলন যদি সঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারে, তবে হয়তো খুব দ্রুতই আমরা এমন এক পৃথিবীর দেখা পাব, যেখানে বিদ্যুৎ হবে অসীম, সাশ্রয়ী এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই নিরন্তর জয়যাত্রা মানবজাতির কল্যাণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করুক, এটাই প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com