ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঝড়েও কেন টলেনি ইসরায়েল? বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ রহস্য

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৮ জুন, ২০২৫
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ১৮ই জুন’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইরান থেকে ছোড়া শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের বৃষ্টির মধ্যেও কেন যেন ইসরায়েল আজও দৃঢ়, স্থির এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ। অনেকেই ভাবছেন—যেখানে একসাথে ২০০টির মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সেখানে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে মাত্র কয়েকটি। এর পেছনে কী ইসরায়েলের বিশেষ কৌশল? নাকি বড় কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির ছায়া রয়েছে তাদের পেছনে?

মূলত, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কৌশল শুধু একটি দেশীয় উদ্যোগ নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত, বহুস্তর এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনে গঠিত প্রতিরক্ষা জোট, যার কারণে ইরানের মতো রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারছে দেশটি।

প্রথমেই, ইরানের মিসাইলগুলো যাত্রা শুরু করে ইসফাহান কিংবা তাবরিজের মতো জায়গা থেকে। এই মিসাইলগুলো মধ্যপ্রাচ্য অতিক্রম করে ইসরায়েল অভিমুখে রওনা হয়। কিন্তু এই পথ যেন এক টুকরো জ্বলন্ত মেঘের ভিতর দিয়ে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা। পথেই অপেক্ষা করে থাকে একের পর এক প্রতিরক্ষা স্তর।

প্রথম স্তরে ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখান থেকে ছোড়া হয় আন্তঃমহাদেশীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। একইভাবে আরব আমিরাত থেকে উড়ে আসে ফরাসি রাফায়েল যুদ্ধবিমান। তারা সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করে এবং মাঝ আকাশেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে অংশ নেয়।

পারস্য উপসাগরে তখন অবস্থান করে মার্কিন রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসন এবং মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এই জাহাজগুলো শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতেই নয়, বরং আকাশসীমার উপর অদৃশ্য রেডার বলয় তৈরি করতে সক্ষম।

যদি এই প্রতিরক্ষা বলয় অতিক্রমও করা যায়, তাহলেও সামনে থাকে জর্ডানের প্রতিরক্ষা ঘাঁটি এবং জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ঘাঁটিগুলোর সেন্সর সিস্টেম ও যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া সাইপ্রাস থেকে উড়ে আসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের টাইফুন এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, যেগুলো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংসে পারদর্শী।

এরপর ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বলয় শুরু হয়। সর্বপ্রথম সক্রিয় হয় Arrow-3—একটি এমন প্রযুক্তি যা মহাকাশেই ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। যদি এটি ব্যর্থ হয়, তবে অপেক্ষা করে Arrow-2, যেটি দূর থেকে ঘাতকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।

এরপর David’s Sling ও Iron Dome ধাপে ধাপে দায়িত্ব নেয়। প্রতিটি প্রতিরক্ষা স্তর যেন আরেকটি নিখুঁত ফিল্টার, যেখানে শেষ পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রই কেবল আঘাত হানতে পারে, সেটিও তীব্র বাধা অতিক্রম করে।

তবে প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর আর কোনো দেশের মিসাইল কি এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়? সম্ভবত না। এটি এক ধরনের টেকনো-পলিটিক্যাল ছায়াযুদ্ধ—যেখানে প্রযুক্তি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একত্রে যুদ্ধ করছে এক ‘দুশমন’কে রুখতে।

ইরানের মিসাইলগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষ—ইসরায়েল—নিজেরাই শুধু যুদ্ধ করছে না, তাদের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, এমনকি কিছু আরব রাষ্ট্রের নীরব অনুমতি ও অংশগ্রহণ।

এটাই এই যুদ্ধের এক নির্মম বাস্তবতা। এককভাবে সাহস ও আত্মত্যাগে ভর করে লড়ছে ইরান, কিন্তু অপর পাশে প্রযুক্তি, অর্থ, নেটওয়ার্ক ও জোটবদ্ধ প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে প্রস্তুত বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর মিত্ররা।

এই অসম যুদ্ধের মাঝখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য এখন শুধু প্রার্থনাই রয়ে যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত