অপ্রতিম হত্যায় আইফোনের সঙ্গে সামনে এলো টাকার বিরোধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
অপ্রতিম হত্যায় আইফোনের সঙ্গে সামনে এলো টাকার বিরোধ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একাধিক কারণ ও সম্পর্কের জটিলতা। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, দামি একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধ, বয়সে বড় কয়েকজনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠতা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের মতো বিষয়ও ঘটনাটির নেপথ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।

জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স ব্যবহার করে ভিডিও ও ছবি তোলার কথা বলে তাকে বাসা থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে তার মৃত্যু হলে ফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর। এ ছাড়া আরও একজন তরুণের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

অপ্রতিম বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল সে। এর আগে মুঠোফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমে তাকে বাইরে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, তুহিন একাধিকবার অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান। তাকে বাসা থেকে বের হয়ে আসতে বলা হয়। একপর্যায়ে অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোন দিয়ে টিকটকের ভিডিও তৈরি ও ছবি তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমন প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিকেল আড়াইটার দিকে ফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, বিকেল তিনটা থেকে সোয়া তিনটার মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের চলাফেরার দৃশ্য পাওয়া যায়। ফুটেজে তাদের পাশাপাশি হাঁটতে ও কথা বলতে দেখা গেছে। কোথাও তাদের আচরণে তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধের বিষয়ও দৃশ্যমান ছিল না। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা যায়। পরবর্তী একটি ফুটেজে চারজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

অপ্রতিমকে শেষ পর্যন্ত লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলটি মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। জায়গাটি তুলনামূলক নির্জন হওয়ায় বাইরে থেকে সহজে সেখানে কী ঘটছে, তা বোঝার সুযোগও কম।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অন্যরাও তাকে আঘাত করে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গুরুতর আঘাতের পর অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় অভিযুক্তরা।

মরদেহ উদ্ধারের পর অপ্রতিমের শরীরে মাথায় গুরুতর আঘাতসহ বিভিন্ন ক্ষত পাওয়া যায়। তবে কোন ক্ষত কখন এবং কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে বলা হয়েছে, রাতে বন্যপ্রাণীর কারণে মরদেহে কিছু অতিরিক্ত ক্ষত তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এসব বিষয়ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা। অপ্রতিমের বাবা যে প্রতিষ্ঠানে মুঠোফোনের যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন, সেখানে কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিম ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সে টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ওই কিশোর অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল। টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ থেকে বিরোধ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। অপ্রতিম না থাকলে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হবে না—এমন চিন্তাও ওই কিশোরের মধ্যে কাজ করেছিল কি না, তা তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের তথ্য এখনো তদন্তের অংশ এবং আদালতে প্রমাণিত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড় কয়েকজনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে যাদের নিয়মিত চলাফেরা ছিল, তারা তার সমবয়সী সহপাঠী ছিল না। তাদের বয়স অপ্রতিমের চেয়ে কয়েক বছর বেশি। একসঙ্গে ছবি তোলা, বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরির তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে।

এই সম্পর্ককে তদন্তকারীরা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তবে শব্দটি দিয়ে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না; বরং অপ্রতিম কীভাবে বয়সে বড়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং সেই সম্পর্ক তাকে কীভাবে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদন্তে একটি মুঠোফোন গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবেও কাজ করেছে। পুলিশ হেফাজতে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার ফোনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোরের কাছ থেকে একাধিক কল আসে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি তদন্তকারীদের সন্দেহ তৈরি করে। পরে ওই কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তার কাছে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্টও পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, ঘটনার দিন ওই কিশোর নিজের ফোন সঙ্গে নেয়নি। পরিবারের অন্য একজনের ফোন ব্যবহার করে বাইরে বের হয়েছিল। কেন সে নিজের ফোন না নিয়ে অন্যের ফোন ব্যবহার করেছিল, সেটিও তদন্তের অংশ। ঘটনাস্থলে তার অবস্থান প্রযুক্তিগতভাবে শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এড়ানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তার বাবার অনুপস্থিতির বিষয়টিও তদন্তকারীরা দেখছেন, যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

অন্যদিকে হত্যার পর অপ্রতিমের আইফোন কোথায় গেছে, সেটিও দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ফোনটি তুহিনের বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে ফোনটি উদ্ধার করে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনটি বাড়িতে লুকিয়ে রাখার বিষয়ে তুহিন তার ছোট ভাইকে বলেছিলেন।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তার মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের সন্ধান চেয়ে আবেদন জানান। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনও তার ছবি ছড়িয়ে দিয়ে তাকে খুঁজে পেতে সহযোগিতার আহ্বান জানায়। কিন্তু শনিবার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসার পর সেই উদ্বেগ রূপ নেয় গভীর শোক ও ক্ষোভে।

অপ্রতিমের মা ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্ন তুলেছিলেন, ফোন নেওয়ার প্রয়োজন থাকলে তাকে হত্যা করা হলো কেন। সন্তানের এমন পরিণতি কোনো পরিবারকে যেন আর দেখতে না হয়—এমন আকুতি জানিয়েছেন তার বাবা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অপ্রতিমের মৃত্যু এখন শুধু একটি হত্যা মামলার তদন্তের বিষয় নয়; একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, বয়সে বড়দের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ এবং দামি প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি আকর্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে পরিবার ও অভিভাবকদের অজান্তে শিশু-কিশোররা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী ধরনের অনলাইন যোগাযোগে যুক্ত হচ্ছে—ঘটনাটি সেই বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এনেছে।

তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা নির্ধারণে তদন্ত, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হলেও আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই চূড়ান্ত বিষয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, পাঁচ হাজার টাকার বিরোধ এবং কথিত ‘অসম বন্ধুত্ব’—কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, সে প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পাওয়ার জন্য আরও তদন্তের অপেক্ষা থাকছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত