প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পিত্তথলির পাথরের অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, ক্লিনিক ভাঙচুর এবং চিকিৎসকের ওপর হামলার অভিযোগের পর জেলায় ৪৮ ঘণ্টার জন্য বেসরকারি চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার বিষয়টি বিবেচনায় সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের উপশম নার্সিং হোম ক্লিনিকে শনিবার অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লা নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের সময় অপারেশন থিয়েটারের টেবিলেই তার মৃত্যু হয়েছে। এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে এবং পরে ক্লিনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ স্বজনদের সঙ্গে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং ক্লিনিকে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পর চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তোলা হয়। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রোববার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে জেলা বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) উদ্যোগে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা ক্লিনিক মালিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ৪৮ ঘণ্টার কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা চুয়াডাঙ্গা জেলার সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস থেকে বিরত থাকবেন। একই সময় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জরুরি ও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু থাকবে। ফলে কর্মসূচির প্রভাব যাতে সাধারণ রোগীদের জীবন ও চিকিৎসার অধিকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জেলা বিএমএর সভাপতি ডা. হাসানুজ্জামান নূপুর জানান, চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বা অভিযোগ থাকলে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা এবং চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, রবগুল মোল্লার মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও তদন্ত শুরু হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের সময় কী ঘটেছিল, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে ক্লিনিকটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে, অন্যদিকে রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়েছে।
নিহত রবগুল মোল্লা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে। বিভিন্ন সূত্রে তার বয়স ৪৮ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির একটি ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার পরিবার ও স্বজনদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বাভাবিক জীবনযাপন করা মানুষ, যিনি পিত্তথলিতে পাথরের চিকিৎসার জন্য একটি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার দুপুরের দিকে রবগুল মোল্লাকে পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য উপশম নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। পরদিন শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। সেখানে ক্লিনিকের মালিক ও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এহসানুল হক তন্ময় অস্ত্রোপচার শুরু করেন। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক হিসেবে সেখানে ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাইসুল ইসলাম জুয়েল।
স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচার চলাকালীন অপারেশন টেবিলেই রবগুল মোল্লার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। চিকিৎসায় অবহেলা বা অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে কি না—এ নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তাই তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া কোনো পক্ষের অভিযোগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ক্লিনিক এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজনরা কয়েক দফায় ক্লিনিকে ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। এ সময় জেলা বিএমএর আহ্বায়ক ডা. হাসানুজ্জামান নূপুর ঘটনাস্থলে গেলে তার ওপরও হামলা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে গুরুতর নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একজন রোগীর মৃত্যু কোনো পরিবারের জন্য কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, রবগুল মোল্লার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর একজন রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রয়োজন।
চুয়াডাঙ্গার সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু একটি রোগীর মৃত্যুর বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রোগীর অধিকার, চিকিৎসকের নিরাপত্তা, বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের প্রশ্ন। ৪৮ ঘণ্টার কর্মসূচির কারণে সাধারণ রোগীদের ওপর যাতে অতিরিক্ত দুর্ভোগ না পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, জরুরি পরামর্শ বা নিয়মিত ফলোআপের প্রয়োজন থাকা রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এখন সবার নজর স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। তদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসকের ওপর হামলা ও ক্লিনিক ভাঙচুরের অভিযোগেরও আইনগতভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এই ঘটনার পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।