প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রোগীর পরিসংখ্যানের গরমিলকে কেন্দ্র করে। রাজধানীর চারটি বড় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, এক দিনে চার হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখানো হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে সংগ্রহ করা তথ্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য সামনে এসেছে। ডেঙ্গুর মতো দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে এমন একটি রোগের ক্ষেত্রে রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য নীতিনির্ধারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের গরমিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম নিয়মিতভাবে রাজধানীর ৭৭টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং দেশের ৬৪ জেলার সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংগ্রহ করে। পরে এসব তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। গণমাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এই পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রকাশিত তথ্যের নির্ভুলতা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে রাজধানীর চারটি হাসপাতালে গত সোমবারের পরিস্থিতি যাচাই করে পরিসংখ্যানের বড় পার্থক্য দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবধান পাওয়া গেছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের বিভিন্ন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সরেজমিনে রোগী গণনা করে ২২১ জন রোগী পাওয়া যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাব ছিল ২২৩ জন। এর বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত তথ্যে ওই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হয় মাত্র ৪৯ জন। অর্থাৎ হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের তুলনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১৭৪ জন রোগী কম ছিল।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলায় শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৪৭ জন শিশুকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাওয়া যায়। একই হাসপাতালে ১১ তলায় পুরুষ এবং ১২ তলায় নারী রোগীদের জন্য পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু রয়েছে। সেখানে যথাক্রমে ৮৯ জন পুরুষ ও ৮৫ জন নারী রোগী ছিলেন। কেবিনের রোগী বাদ দিয়েও সরেজমিনে পাওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল দুই শতাধিক।
শুধু এক দিনের হিসাবেই নয়, বছরের শুরু থেকে রোগীর মোট সংখ্যার ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে সোমবার পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে ৪ হাজার ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে এই সময়ে রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৭৩ জন। অর্থাৎ দুই উৎসের হিসাবে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪২৬ জন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। হাসপাতালের নতুন ভবনের কয়েকটি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সরেজমিনে ১২৮ জন রোগী গণনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোর তথ্যের সঙ্গেও এ সংখ্যা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তর জানিয়েছে, সোমবার মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ২০০ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন শিশু।
এর বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। অর্থাৎ হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে পার্থক্য ছিল ৯৫ জনের। বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলের হিসাবে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৯৯ জন। একই সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে তা ২ হাজার ১২৭ জন। এখানেও ২৭২ জনের গরমিল রয়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সেখানে ২৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগীর সংখ্যা ছিল ১৫৪ জন। দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ৮৮ জন। বছরের শুরু থেকে হাসপাতালটিতে ৩ হাজার ৬৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে সেই সংখ্যা ২ হাজার ৮৯৬ জন। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও ৭৪২ জনের ব্যবধান রয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রে পার্থক্য আরও বড়। হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সেখানে ১৫২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগী ছিলেন মাত্র আটজন। অর্থাৎ এক দিনের হিসাবে ১৪৪ জনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৪৩২ জন শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এই সংখ্যা ২৪২ জন, অর্থাৎ ১৯০ জনের গরমিল রয়েছে।
চারটি হাসপাতালের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে পরিস্থিতির ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়। হাসপাতালগুলোর হিসাবে সোমবার মোট ৮১৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে এই সংখ্যা ৩১৬ জন। অর্থাৎ ৫০১ জন রোগীর পার্থক্য রয়েছে, যা মোট রোগীর প্রায় ৬১ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, হাসপাতালগুলো থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতেই নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমত আরা জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে পাঠানো তথ্যই তাঁরা প্রকাশ করেন এবং ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশের সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না। ঢাকার বাইরেও সব বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে পৌঁছায় না। অনেকে আবার চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার বা ছোট পরিসরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীকে সরকারি পরিসংখ্যানের আওতায় আনা কঠিন।
তবে যেসব হাসপাতাল থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্যেও যদি পার্থক্য থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কারণ রোগীর প্রকৃত সংখ্যা কম দেখানো হলে রোগের বিস্তারের বাস্তব চিত্র নীতিনির্ধারকদের সামনে যথাযথভাবে নাও আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে হাসপাতালের শয্যা ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসক ও নার্সের প্রয়োজন নির্ধারণ, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পরিকল্পনায়।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন ডেঙ্গুর রোগীর তথ্যের এমন গরমিলকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, রোগীর সংখ্যা কম দেখানো হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও কমে যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৬৫৫ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ছয়জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৩ হাজার ৬২৭ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০ জন।
ডেঙ্গুর প্রকোপের সময়ে রোগীর সঠিক সংখ্যা জানা শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। হাসপাতালের বাস্তব পরিস্থিতি, রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর চিত্রের সঙ্গে সরকারি হিসাবের সামঞ্জস্য থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। অন্যদিকে বিভিন্ন উৎসের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলে সাধারণ মানুষ, চিকিৎসক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। একই রোগীর তথ্য যেন বাদ না পড়ে, আবার একই রোগীর তথ্য একাধিকবার যুক্তও না হয়—এ জন্য তথ্য যাচাই ও হালনাগাদের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা জরুরি। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো মৌসুমি ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জনস্বাস্থ্য সংকটে প্রতিদিনের নির্ভুল তথ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
রাজধানীর চারটি হাসপাতালের তথ্যের এই গরমিল এখন স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে—দেশে ডেঙ্গুর প্রকৃত রোগীর সংখ্যা কত এবং সরকারি পরিসংখ্যান কতটা বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে। এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত যাচাই আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।