প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই বড় চমকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল জাপান। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২ রানের ব্যবধানে হারতে হয়েছে স্বাগতিকদের। বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি নেমে এসেছিল ৫ ওভারে। সেই ছোট পরিসরের ম্যাচেও ভারতকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল জাপানের ক্রিকেটাররা। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও চাপ সামলানোর দক্ষতায় ভারত ম্যাচটি নিজেদের করে নেয়।
জাপানের সানো ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি দুই দলের জন্যই ছিল বিশেষ তাৎপর্যের। ভারত ও জাপানের পুরুষ ক্রিকেট দল এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে মুখোমুখি হয়। ফলে ম্যাচটি ঘিরে দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ জাপানের ক্রিকেটের জন্যও ছিল বড় ঘটনা।
তবে ম্যাচ শুরুর আগে যে ব্যবধানটা কাগজে-কলমে ছিল, মাঠে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বৃষ্টিতে আউটফিল্ড ভেজা থাকায় নির্ধারিত ২০ ওভারের ম্যাচ কমিয়ে ৫ ওভারে আনা হয়। পিচ ও মাঠের পরিস্থিতিও ব্যাটিংয়ের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। প্রথম বল থেকেই স্পিনাররা উইকেট থেকে ভালো টার্ন পাচ্ছিলেন। ধীরগতির আউটফিল্ডের কারণে ব্যাটারদের জন্য দ্রুত রান তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে ভারত। জাপানের বোলাররা পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে আটকে রাখেন। জাপানের অধিনায়ক কেনডেল কাদাওয়াকি-ফ্লেমিং যে তিনজন বোলারকে ব্যবহার করেন, তারা সবাই ছিলেন স্পিনার। সেই স্পিন আক্রমণের সামনে ভারতীয় ব্যাটারদের স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অভিষেক শর্মা প্রথম বলেই আউট হয়ে যান। চার্লি হারা-হিঞ্জের বলে তাঁর ইনিংস শেষ হয় কোনো রান না করেই। এরপর সঞ্জু স্যামসনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তিনি ৭ বলে করেন ৯ রান। ফলে অল্প সময়ের ম্যাচে ভারতের রান আরও চাপে পড়ে যায়।
ভারতের হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার। তাঁর ১২ বলে ১৬ রানের ইনিংসই হয়ে ওঠে দলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫ ওভারে ভারত ৪ উইকেট হারিয়ে ৩২ রান সংগ্রহ করে। বৃষ্টিবিঘ্নিত এবং স্পিন সহায়ক কন্ডিশনে এই রানও জাপানের জন্য সহজ লক্ষ্য ছিল না।
৩৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে জাপান শুরুতেই উইকেট হারায়। ভারতীয় বোলাররাও বুঝে গিয়েছিলেন, এই ম্যাচে প্রতিটি রান এবং প্রতিটি বল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাপানের ব্যাটাররা ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকেন। ভারতীয় স্পিনার রবি বিষ্ণোইয়ের এক ওভারে ১০ রান তুলে নেয় জাপান। তাতেই ম্যাচের চিত্র কিছুটা বদলে যায়।
একপর্যায়ে শেষ দুই ওভারে জাপানের প্রয়োজন ছিল ১৬ রান। এরপর সেই সমীকরণ আরও সহজ হয়ে আসে। শেষ ৮ বলে জাপানের প্রয়োজন দাঁড়ায় মাত্র ৮ রান। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ভারতকে হারিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় এক অধ্যায়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে জাপান।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভারতীয় বোলাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। ওয়াশিংটন সুন্দর ও অক্ষর প্যাটেল চাপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বোলিং করেন। জাপানের ব্যাটাররা প্রয়োজনীয় রান তুলতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ৩০ রানেই থেমে যায় তাদের ইনিংস। ফলে মাত্র ২ রানে জয় পায় ভারত।
ফলাফল ভারতের পক্ষে গেলেও ম্যাচটির বড় গল্প হয়ে থাকল জাপানের লড়াই। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান অনেক বড় হলেও মাঠে জাপান সেই পার্থক্যকে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে দেয়নি। বিশেষ করে তাদের স্পিনাররা ভারতীয় ব্যাটারদের যেভাবে আটকে রেখেছিলেন, সেটি ম্যাচের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে ওঠে।
ভারত এই সংস্করণে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল। অন্যদিকে জাপান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো নিজেদের জায়গা তৈরি করার পর্যায়ে রয়েছে। এমন একটি দলের বিপক্ষে মাত্র ২ রানে হার, সেটিও যখন ম্যাচের শেষ বল পর্যন্ত উত্তেজনা ধরে রেখে, তখন জাপানের পারফরম্যান্সকে তাদের ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এই ম্যাচটি আয়োজনের পেছনেও ছিল বিশেষ একটি উপলক্ষ। ভারত ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ম্যাচটি আয়োজন করা হয়। খেলাধুলার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবেও ম্যাচটিকে দেখা হয়েছে। ক্রিকেটের মাঠে দুই দেশের এই প্রথম টি-টোয়েন্টি মুখোমুখি হওয়া সেই আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারতের জন্য ম্যাচটির আরেকটি গুরুত্ব ছিল এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি। এবারের এশিয়ান গেমস জাপানেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ক্রিকেট প্রতিযোগিতাও এর অংশ। ভারত সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ায় তাদের গ্রুপ পর্বে খেলতে হচ্ছে না। ফলে জাপানের কন্ডিশন, মাঠের পরিবেশ এবং আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে এই ম্যাচটি কাজে লাগিয়েছে ভারত।
ম্যাচের পর ভারতের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় অবশ্য জয়। তবে ৩২ রান করে শেষ পর্যন্ত ২ রানের জয় নিশ্চিত করা দলটির ব্যাটিং নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে জাপান এই ম্যাচ থেকে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস। বড় দলের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর পাশাপাশি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ক্রিকেটে কখনো কখনো বড় দলের বিপক্ষে ছোট ব্যবধানের হারও একটি দলের জন্য ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে দেয়। জাপানের ক্ষেত্রেও এই ম্যাচ তেমন একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে। ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি, কিন্তু ভারতকে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষায় রেখে দেওয়া এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের সম্ভাবনা ধরে রাখা জাপানের ক্রিকেটের জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ভারত এখন এশিয়ান গেমসের পরবর্তী চ্যালেঞ্জের দিকে তাকাবে। ২৮ সেপ্টেম্বর কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নামবে তারা। প্রতিপক্ষ তখনও নির্ধারিত হয়নি। তার আগে জাপানের বিপক্ষে পাওয়া এই জয় ভারতকে জয় এনে দিলেও ম্যাচটি তাদের সামনে কিছু প্রশ্নও রেখে গেছে। আর জাপানের জন্য এই হার হয়তো আক্ষেপের, তবে একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠতে পারে।