টিকটক ঘিরে কুমিল্লায় বাড়ছে কিশোর গ্যাং

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
টিকটক ঘিরে কুমিল্লায় বাড়ছে কিশোর গ্যাং

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লা শহরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিকটক ভিডিও তৈরিকে কেন্দ্র করে কিশোর ও তরুণদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে জড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড শুধু অনলাইন ভিডিও তৈরি কিংবা আড্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া, সংঘর্ষ, ছিনতাই, মাদক কারবার এবং হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও এসব দলের সদস্যদের নাম আসছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গত মে মাসের এক বিকেলে কুমিল্লার কাপ্তানবাজার এলাকায় কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শতাধিক কিশোর ও তরুণ অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ পর্যন্ত এলাকায় ছোট ছোট দলে তাদের চলাচল দেখা যায়। কারও হাতে ছিল রামদা, কারও হাতে চাপাতি বা লাঠি। সামনে ছিল উচ্চ শব্দে চলা কয়েকটি মোটরসাইকেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই ওই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই দলের নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। শহরে নতুন এই দলের আত্মপ্রকাশের বিষয়টি পুলিশের নজরেও আসে। এর মধ্য দিয়ে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের আরেকটি চিত্র সামনে আসে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কিশোর ও তরুণ গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। বর্তমানে অন্তত কয়েকটি সক্রিয় গ্রুপ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে আট মাসেই বেশ কয়েকটি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে তাঁকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে অপ্রতিমকে একটি কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির মাধ্যমে কিশোরদের একত্র করা এবং ধীরে ধীরে একটি দল তৈরি করার চেষ্টা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অপ্রতিমকেও সেই দলে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

অপ্রতিমের হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের জীবনযাপনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দামি মুঠোফোন এবং মোটরসাইকেলের প্রভাবের কথা সামনে এসেছে। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য, তাঁদের মধ্যে কেউ পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনেছিল। কেউ আবার মোটরসাইকেল ব্যবহার করত। এসব প্রযুক্তি ও যানবাহনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

কুমিল্লা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্থানীয়দের মতে, ২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন কয়েকটি দল সক্রিয় থাকলেও পরবর্তী সময়ে দল ও উপদলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের দিকে শহরে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় ছিল বলে বিভিন্ন সময় তথ্য পাওয়া যায়। এসব দলের অনেকের নিজস্ব নাম, প্রতীক, পোশাকের ধরন, চুলের স্টাইল, আড্ডাস্থল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ ছিল।

২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় অন্তত এক ডজন হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে বলে স্থানীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর বাইরে সংঘর্ষ, অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক, ছিনতাই ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার সঙ্গেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্র হাতে একদল কিশোরের মহড়ার ঘটনা আলোচনায় আসে। একই বছরের ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলার সময় রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া এলাকায় অস্ত্রধারী কিশোরদের উপস্থিতি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তারা দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি শব্দ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

কুমিল্লার পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত আড়াই শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ার পর দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের ডেকে মুচলেকা নেওয়া হলেও এতে স্থায়ীভাবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না। পুলিশ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি গোষ্ঠীর নাম বারবার আলোচনায় আসছে। কিং স্কোয়াড, রতন বা স্কোয়াড গ্রুপ, ইগল, সিবিকে এবং ক্রাইম সেটআপের মতো দলগুলোর তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। এর বাইরে অপু ও সাব্বির নামেও কয়েকটি গ্রুপের কথা জানা যায়। তবে একই ব্যক্তি একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরা করায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে বয়সের সীমাও সবসময় স্পষ্ট নয়। ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত কিছু দলের সঙ্গে ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের পাশাপাশি ১৯, ২০, ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী তরুণদেরও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ঘটনায় আরও বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নামও এসেছে। ফলে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে বয়সে বড় তরুণদের যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

মাদক কারবার নিয়েও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের তথ্য রয়েছে। গত বছর অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে মারধর ও ছুরিকাঘাতের পর তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবারের বিরোধ ছিল। চলতি বছরের জুনে কাঁটাবিল এলাকায় মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে দুই স্থানীয় দলের বিরোধের সময় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয় বলে জানা গেছে।

শুধু অপরাধ নয়, জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় দলবদ্ধ উপস্থিতির মাধ্যমেও আতঙ্ক তৈরি করছে এসব গোষ্ঠী। অভিভাবকদের কেউ কেউ সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এসব দলের সঙ্গে মিশে পড়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে। কারণ বন্ধুত্ব, আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির মতো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কর্মকাণ্ড থেকেই ধীরে ধীরে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টিকটক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির মাধ্যমে অনেক কিশোরের পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। দামি মুঠোফোন, মোটরসাইকেল এবং অনলাইনে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতাও তৈরি করছে। ভিডিওতে অস্ত্র, মোটরসাইকেল কিংবা ভয় দেখানো বক্তব্য ব্যবহার করে নিজেদের আলাদা পরিচিতি তৈরির চেষ্টা দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনাতেও এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে একাধিক কিশোরের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে সেই যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।

এ অবস্থায় কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছে এবং কীভাবে অর্থ ব্যয় করছে—এসব বিষয়ে পরিবারের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।

একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু গ্রেপ্তার ও মামলা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বয়স কম থাকায় আইনি প্রক্রিয়ার পর মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার যে প্রবণতার কথা পুলিশ জানিয়েছে, তা মোকাবিলায় পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং পরিবারভিত্তিক উদ্যোগও প্রয়োজন হতে পারে।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি পরিবার ও সমাজের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। টিকটক ভিডিও কিংবা বন্ধুত্বের মতো ছোট পরিসরের যোগাযোগ কখন অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় রূপ নিচ্ছে, সেটি অনেক সময় পরিবার বুঝে উঠতে পারছে না। ফলে কিশোরদের নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, অনলাইন ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত