দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্স, ২৩ দিনে ৪৭ রোগী শনাক্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্স, ২৩ দিনে ৪৭ রোগী শনাক্ত

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ দিনে অন্তত ৪৭ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, কাঁচা মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একের পর এক রোগী হাসপাতালে আসায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা মূলত গবাদিপশুর মধ্যে দেখা দেওয়া একটি সংক্রামক রোগ, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যেও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক পশুর মৃতদেহ, রক্ত, চামড়া বা মাংসের সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দৌলতপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও অসুস্থ গরু জবাই এবং মাংস কাটাকাটির সঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে।

দৌলতপুরের গাছেরদিয়াড় গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলামও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। পাশের বাড়ির একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দ্রুত সেটি জবাই করা হয়। বিষয়টির ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই তিনি ওই গরুর মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছার কাজে অংশ নেন। কয়েক দিন পর তাঁর হাত ও আঙুলে ছোট ছোট গুটি ও ফোসকার মতো দাগ দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বড় হয়ে ক্ষতে পরিণত হয়। ক্ষতের মাঝখানে কালো রং দেখা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর জ্বর ও শরীর ব্যথাও শুরু হয়।

প্রথম দিকে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি রফিকুল। কিন্তু ক্ষত বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা অ্যানথ্রাক্সের কথা জানান। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রফিকুলের অভিজ্ঞতা দৌলতপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের ২৩ দিনে অন্তত ৪৭ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ গবাদিপশু জবাই অথবা কাঁচা মাংস কাটাকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে মানুষের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে পশুর অসুস্থতা ও তা গোপনে জবাই করার প্রবণতাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সারা বছরই কমবেশি অ্যানথ্রাক্সের রোগী হাসপাতালে আসেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আগে উপজেলার কিছু নির্দিষ্ট এলাকা, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী হাসপাতালে আসছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় নয়, পুরো উপজেলায় সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্সের ক্ষেত্রে মানুষের অসতর্কতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো গরু বা অন্য গবাদিপশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি দ্রুত জবাই করে মাংস বিক্রি বা বিতরণ করা নিরাপদ নয়। বরং পশুটির অসুস্থতার কারণ নির্ণয়ের জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। অসুস্থ পশু জবাই করে তার মাংস মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে একসঙ্গে অনেক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

দৌলতপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কোনো পশু অসুস্থ হলে অনেক সময় মালিক আর্থিক ক্ষতি এড়াতে সেটি দ্রুত বিক্রি কিংবা জবাই করার সিদ্ধান্ত নেন। কেউ কেউ কম দামে অসুস্থ পশু বিক্রি করে দেন। পরে সেই পশুর মাংস স্থানীয়ভাবে ভাগ করে নেওয়া বা বিক্রি করার ঘটনা ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতি অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানিয়েছেন, অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে অসুস্থ পশু গোপনে জবাই করে বিক্রি করার প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে মালিকরা অনেক সময় কম দামে সেটি বিক্রি বা জবাই করার চেষ্টা করেন। পরে ওই পশুর মাংস কাটাকাটি ও পরিষ্কার করার কাজে অংশ নিয়ে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। অসুস্থ পশু জবাই করে মাংস বিক্রি ঠেকাতে সচেতনতার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

অ্যানথ্রাক্সের ক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষের শরীরে সাধারণত ত্বকের মাধ্যমে সংক্রমণের পর গুটি, ফোসকা বা ক্ষত তৈরি হতে পারে। ক্ষতের মাঝখানে কালো অংশ দেখা দিতে পারে এবং জ্বর, শরীর ব্যথাসহ অন্যান্য উপসর্গও দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

দৌলতপুরের বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অন্য এলাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে অ্যানথ্রাক্সের ঘটনা সামনে এসেছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির পর অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৩৪ জনে পৌঁছেছিল। সেখানে আক্রান্তদের একটি অংশ অসুস্থ পশুর মাংসের সংস্পর্শে এসেছিলেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের ঘটনা সামনে আসায় গবাদিপশুর রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। একটি এলাকায় পশুর মধ্যে রোগের উপস্থিতি দেখা দিলে শুধু পশুকে চিকিৎসা বা টিকা দেওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থ বা সন্দেহজনক পশুর ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। পশু মারা গেলে কিংবা গুরুতর অসুস্থ হলে সেটি কেটে মাংস খাওয়া বা বিক্রি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে মৃত বা অসুস্থ পশুর রক্ত, মাংস ও চামড়ার সংস্পর্শে যারা আসেন, তাদেরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

গ্রামাঞ্চলে অনেক মানুষ পশু পালনকে জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেখেন। একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি হারানোর আশঙ্কায় অনেক পরিবার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আর্থিক ক্ষতি এড়াতে অসুস্থ পশু জবাই করলে ঝুঁকি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই কৃষক ও পশুপালকদের জন্য দ্রুত সরকারি পরামর্শ ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দৌলতপুরের ৪৭ রোগীর ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। একটি অসুস্থ গরু থেকে শুরু করে মাংস কাটাকাটি ও মানুষের সংস্পর্শ—অসতর্কতার একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে একাধিক মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে, রফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ। এখন রোগের বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে পশুর টিকাদান, নজরদারি, অসুস্থ পশু জবাই বন্ধ, নিরাপদভাবে পশু ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তৎপরতা আরও জোরদার হবে এবং অসুস্থ পশু গোপনে জবাই বা বিক্রির প্রবণতা কার্যকরভাবে বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির শরীরে সন্দেহজনক গুটি, ফোসকা, কালো ক্ষত, জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আতঙ্ক নয়, সময়মতো চিকিৎসা এবং সতর্কতাই দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত