প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার একটি গ্রামে মাদক বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তির বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর স্থানীয় মুসল্লি ও কয়েকজন বাসিন্দা গোবিন্দাসী ইউনিয়নের স্থলকাশী গ্রামের ওই বাড়িতে গিয়ে টিনের চাল ও বেড়ার কিছু অংশ ভেঙে দেন। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে মাদক বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থলকাশী গ্রামের সুরমান আলী, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলে সোহাগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি থেকে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকসেবীরা নিয়মিত ওই বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ থাকলেও শুক্রবারের ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক বিক্রির অভিযোগ নিয়ে এর আগেও ওই পরিবারকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে অভিযোগের পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, বাড়িটিকে কেন্দ্র করে মাদকসেবীদের আনাগোনা স্থানীয় পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল এবং বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে স্থানীয় মুসল্লি ও কয়েকজন বাসিন্দা সুরমান আলীর বাড়িতে যান। সে সময় সুরমান আলী, তাঁর স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে সেখানে উপস্থিত লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়িটির টিনের চাল ও বেড়ার কিছু অংশ ভাঙচুর করেন।
ঘটনার সময় স্থানীয়দের কেউ কেউ মাদক বিক্রির অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে ওই বাড়ি থেকে মাদক বিক্রি করা হলে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো বাড়িঘর বা সম্পত্তিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সুরমান আলী দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় মানুষ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রশাসনের ভয় দেখানো হতো। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেও মাদক ব্যবসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওই বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।
স্থানীয়দের একজনের দাবি, সুরমান আলী বর্তমানে ঢাকায় থাকেন এবং তাঁর স্ত্রী বাড়িতে থেকে কথিত মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পরিবারের বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, সুরমান আলী অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তবে এই দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের জন্য আইনগত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ঘটনার বিষয়ে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে। তিনি বলেন, সুরমান আলী ঢাকায় থেকে তাঁর স্ত্রীকে দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন—এমন অভিযোগ পুলিশ শুনেছে। ওই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় লোকজন তাঁর বাড়িতে ভাঙচুর করেছে বলে তিনি জানান। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মাদক বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাটিও আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে গুরুত্ব বহন করে। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ বা উদ্বেগ থাকলেও সরাসরি কোনো বাড়িতে হামলা বা সম্পত্তি নষ্ট করা আইনগতভাবে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদককে ঘিরে সামাজিক অস্থিরতার ঘটনা নতুন নয়। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনে নয়, একটি পরিবার ও পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো আবাসিক এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের অভিযোগ উঠলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই উদ্বেগের সমাধান করতে গিয়ে যদি সংঘবদ্ধভাবে কারও বাড়িঘরে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তাহলে সমস্যার পাশাপাশি নতুন আইনগত ও সামাজিক সংকটও তৈরি হতে পারে।
স্থলকাশীর ঘটনাটিও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই বাড়িকে ঘিরে মাদক বিক্রির কার্যক্রম চলছিল। অন্যদিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এখন অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ এবং এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা—সবকিছুর জন্য আইনগত প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের প্রত্যাশা, মাদকের অভিযোগ থাকলে পুলিশ বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি যাতে হয়রানি বা ক্ষতির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ মাদকবিরোধী সামাজিক অবস্থান তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন অভিযোগের পাশাপাশি ন্যায়সংগত তদন্ত ও আইনের শাসন নিশ্চিত থাকে।
ভূঞাপুর থানার পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে পুলিশি তদন্তে মাদক বিক্রির অভিযোগের সত্যতা, বাড়িটিকে ঘিরে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অস্তিত্ব এবং ভাঙচুরের ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন—এসব বিষয় পরিষ্কার হতে পারে।
এদিকে শুক্রবারের ঘটনার পর স্থলকাশী এলাকায় নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। অভিযোগের বিচার যেন জনতার হাতে না গিয়ে যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়—এটাই এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
স্থলকাশীর ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, স্থানীয়দের তোলা মাদক ব্যবসার অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা কী এবং বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় কারা আইনগতভাবে দায়ী। তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনাটি যেন আরও বড় সামাজিক সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণ না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষ।