প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন রাবেয়া খাতুন নামে ৩৭ বছর বয়সী এক নারী। ট্রেনে ওঠার সময় পা পিছলে প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে পড়ে গেলে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় শরীরের বিভিন্ন অংশেও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোরে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার সকাল ৮টার দিকে মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে রাজশাহী থেকে খুলনাগামী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসে ওঠার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্টেশনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেশনে নির্ধারিত বিরতি শেষে ট্রেনটি ছেড়ে দেওয়ার সময় রাবেয়া দ্রুত ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। সেই মুহূর্তে অসাবধানতাবশত তার পা পিছলে যায়। ভারসাম্য হারিয়ে তিনি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে পড়ে যান। এরপর চলন্ত ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় স্টেশন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় রাবেয়া খাতুনকে উদ্ধারের জন্য খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসে। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।
দুর্ঘটনায় শুধু দুই পা নয়, রাবেয়ার একটি হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশেও গুরুতর আঘাত লাগে। প্রচুর রক্তক্ষরণ ও গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে যশোরে পাঠানো হয়েছে।
মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার নয়ন খন্দকার দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে আহত নারীকে উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় পরে তাকে যশোরে পাঠানো হয়েছে।
রাবেয়া খাতুন ঢাকার খিলক্ষেতের জোয়ার সাহারা এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেনের মেয়ে। তিনি রাজশাহী থেকে খুলনাগামী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসের যাত্রী ছিলেন। স্বাভাবিক একটি রেলযাত্রা যে এত ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছাবে, তা যাত্রীটির জন্য যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল, তেমনি তার স্বজনদের কাছেও ঘটনাটি গভীর উদ্বেগ ও শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেলস্টেশনে ট্রেন থামার পর যাত্রীরা সাধারণত দ্রুত নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ওঠানামা করেন। বিশেষ করে ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উঠতে গিয়ে তাড়াহুড়া করেন। এই সময় সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। মোবারকগঞ্জের ঘটনাটি সেই ঝুঁকির একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।
চলন্ত ট্রেনে ওঠা বা নামার সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই প্রশ্ন ওঠে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন এবং ট্রেন ছাড়ার সময় প্ল্যাটফর্মে থাকা যাত্রীদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যেও নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলযাত্রায় সময়মতো ট্রেনে ওঠার তাগিদ অনেক সময় যাত্রীদের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ট্রেন ছাড়ার পর দৌড়ে উঠে পড়ার চেষ্টা, দরজায় ঝুলে থাকা কিংবা চলন্ত ট্রেন থেকে নামার মতো আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলতে শুরু করে, তখন একজন যাত্রীর কয়েক সেকেন্ডের তাড়াহুড়া জীবনভর বহন করতে হতে পারে এমন ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রাবেয়া খাতুনের ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে তিনি ট্রেন ছাড়ার সময় উঠতে গিয়েছিলেন এবং দুর্ঘটনার আগে তিনি কোন অবস্থানে ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রেন ছাড়ার সময় তিনি তাড়াহুড়া করে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন এবং তখনই পা পিছলে পড়ে যান। দুর্ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রাবেয়ার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে। দুই পা হারানোর পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অংশে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তার সামনে দীর্ঘ চিকিৎসাপ্রক্রিয়া অপেক্ষা করছে। এমন একটি দুর্ঘটনা একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার স্বাভাবিক জীবনযাপন, কর্মজীবন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রেলস্টেশনে উপস্থিত অন্য যাত্রীদের জন্যও এই দুর্ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। ট্রেনের নির্ধারিত দরজা দিয়ে নিরাপদে ওঠানামা করা, ট্রেন সম্পূর্ণভাবে থামার পর ওঠা এবং ট্রেন চলতে শুরু করলে কোনোভাবেই ওঠার চেষ্টা না করা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে। কয়েক মিনিটের অপেক্ষা কখনোই জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের শনিবার সকালের এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, রেলযাত্রায় সামান্য অসতর্কতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। স্বজনদের উদ্বেগের মধ্যে এখন চিকিৎসাধীন রাবেয়া খাতুনের সুস্থতার জন্য অপেক্ষা চলছে। তার জীবন যেন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি না হয়—এমন প্রত্যাশাই এখন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীদের সচেতনতা এবং রেলস্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।