দ্বিতীয় দফায় ৩৪ লাখ শিশুর হামের টিকাদান শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
দ্বিতীয় দফায় ৩৪ লাখ শিশুর হামের টিকাদান শুরু

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের সুরক্ষায় দ্বিতীয় দফার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এ ধাপে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলা বা এমআর টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তির টিএনটি খেলার মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সরকারের এই বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে তৈরি হওয়া ঘাটতির প্রভাব এখন দেশের শিশুদের ওপর পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, হাম শুধু একটি সাধারণ সংক্রামক রোগ নয়; বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা তৈরি করে জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে টিকার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২৮ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে একই বয়সসীমার প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু অংশ নেয়। দুই কর্মসূচির তথ্য তুলনা করে দেখা যায়, প্রায় ৪৩ লাখ শিশুর টিকাদান পরিস্থিতিতে ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় যাচাই ও হিসাবের পর প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে দ্বিতীয় দফার বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ঘটতে পারে। শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে একই পরিবারের পাশাপাশি বিদ্যালয়, বস্তি, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলেও ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নয়, সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালের পর নিয়মিতভাবে চার বছর পরপর পরিচালিত হওয়ার কথা থাকা এমআর টিকাদান কর্মসূচিতে বিরতি তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অনেক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলোর কষ্টের বিষয়টিও উঠে আসে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করে শিশুদের নিরাপদ রাখতে এখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

একটি শিশুর জন্য হাম আক্রান্ত হওয়ার অর্থ শুধু কয়েক দিনের জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি নয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে হামের পর নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুর পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা, ওষুধ ও পরিচর্যার চাপ সামলাতে হয়। কখনো কখনো অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর প্রয়োজন হয়, যা পরিবারের জন্য মানসিক ও আর্থিক চাপও তৈরি করতে পারে।

এই বাস্তবতায় দ্বিতীয় দফার টিকাদান কর্মসূচি শুধু একটি সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, বরং বহু পরিবারের জন্য শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরা যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের টিকা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। কোনো কারণে আগে টিকা না নেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে দেশের চিকিৎসকদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মহামারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মহামারির সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকটের সময় তাঁদের পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিতেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমসহ সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, হাম বা অন্য কোনো মহামারি মোকাবিলা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠন—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে টিকাদানের বার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির তথ্য পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিভাবক কর্মসূচির সময়সূচি, বয়সসীমা বা টিকা নেওয়ার স্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানার কারণে সন্তানকে কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারেন না। আবার কোনো কোনো পরিবার টিকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে পিছিয়ে থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সরাসরি যোগাযোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিতীয় দফার এই কর্মসূচির মাধ্যমে টিকার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কার্যক্রমের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রকৃতপক্ষে কতসংখ্যক শিশু টিকা পাচ্ছে এবং বাদ পড়া শিশুদের কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর। টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও হামের জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

হামের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে একটি শিশুর অসুস্থতা কখনো কখনো পুরো পরিবারের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সময়মতো টিকা, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার অভ্যাস শিশুদের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের দ্বিতীয় দফার বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার একটি উদ্যোগ। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের সর্বোচ্চ সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো এবং শিশুস্বাস্থ্যের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত