প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গণপরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশে আরও ১০০টি পিংক বাস চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন শহরে ১৩টি রুটে ১৪টি পিংক বাস চলাচল করছে। তবে স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেতরমুখী নারী যাত্রীর তুলনায় বিদ্যমান বাসের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় সেবাটি দ্রুত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে নারী যাত্রীদের জন্য চলমান বিশেষ বাসসেবা আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, সড়ক-মহাসড়কের শৃঙ্খলা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়।
নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা চালুর পেছনে মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণপরিবহনে তাদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও কর্মজীবী মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে চলাচল করেন। ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিয়মিত বাস চলাচল এবং যাতায়াতের পথে নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কারণে অনেক নারীকে প্রতিদিন বাড়তি ঝুঁকি ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। এমন বাস্তবতায় পিংক বাস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগকে গণপরিবহন ব্যবস্থায় নারীবান্ধব অবকাঠামো তৈরির একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের আগস্টে বিআরটিসির উদ্যোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় প্রাথমিকভাবে পিংক বাস সার্ভিস চালু করা হয়। শুরুতে ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস দিয়ে এই বিশেষ সেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব বাসে শুধু নারী যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ সেবাটিকে আরও কার্যকর করতে নারী চালক ও সহকারী নিয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর ফলে নারীদের জন্য শুধু আলাদা পরিবহন নয়, পরিবহন খাতেই নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে যে সংখ্যক বাস চলছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় নতুন করে আরও ১০০টি বাস যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে নারী যাত্রীদের জন্য ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। ধাপে ধাপে এসব বাস বিশেষ পিংক বাস সার্ভিসে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে একদিকে নারী যাত্রীদের জন্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে গণপরিবহনে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পিংক বাস সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু বাসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং বাসগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ই-টিকিটিং ব্যবস্থার ফলে যাত্রীদের টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধা পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টি শুধু বাসের ভেতরের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাসস্টপে অপেক্ষার সময়, বাসে ওঠা-নামা এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পরের পথও নারী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। তাই পিংক বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সূচি, পর্যাপ্ত স্টপেজ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যাত্রী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ বাসস্টপ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছাত্রীদের জন্য নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক পরিবারে মেয়েদের দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতায়াতের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপদ ও নির্ধারিত গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকলে পরিবারের উদ্বেগ কিছুটা কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিও সহজ হতে পারে।
একইভাবে কর্মজীবী নারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অফিসের নির্ধারিত সময় মেনে চলা, প্রতিদিন একই রুটে যাতায়াত করা এবং কর্মস্থল থেকে নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য সময়নিষ্ঠ পরিবহন প্রয়োজন। বাসের সংখ্যা কম হলে একটি বাসে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। নতুন ১০০টি বাস যুক্ত হলে এই চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ালেই সেবার মান নিশ্চিত হবে না। নতুন বাসগুলো কোন কোন রুটে চলবে, দিনের কোন সময়ে চলবে এবং কতক্ষণ পরপর পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ও নারী যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় নারী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত বেশি, সেসব রুটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর বিষয়েও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো সোজা ও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। নতুন যেসব সড়ক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে প্রয়োজনীয় নকশাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সড়ককে আরও নিরাপদ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভাগ ও দপ্তরগুলোর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও গৃহীত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রণে প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এলাকায় ৭২ একর জমির ওপর নির্মিত একটি রিসোর্টের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, সেতু বিভাগের সচিবসহ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নারীদের জন্য পিংক বাস সম্প্রসারণের উদ্যোগটি তাই কেবল নতুন কিছু বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা নয়; এটি শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বাসগুলো নিয়মিত চলাচল, পর্যাপ্ত রুট কাভারেজ, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং সেবার মান কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। নতুন বাস যুক্ত হওয়ার পর যদি নির্ধারিত সময়সূচি বজায় থাকে, যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমে এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়, তাহলে বিশেষ এই সেবা আরও বেশি নারীকে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে।
শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রয়োজনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। তাদের জন্য নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও সহজলভ্য পরিবহন শুধু যাতায়াতের সুবিধা নয়, বরং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সেই বিবেচনায় আরও ১০০টি পিংক বাস চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নারী যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হবে সেবাটিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, নিয়মিত ও সত্যিকার অর্থে যাত্রীবান্ধব করে তোলার।