সন্তান থাকলেও হাসপাতালের বিছানায় একা ৭০ বছরের বৃদ্ধা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
সন্তান থাকলেও হাসপাতালের বিছানায় একা ৭০ বছরের বৃদ্ধা

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সন্তান আছে, পরিবার আছে—তবু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হাসপাতালের বিছানায় একা পড়ে আছেন ৭০ বছরের বেশি বয়সী এক অসহায় বৃদ্ধা। নিজের নাম-পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারেন না তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে কখনো রাস্তার পাশে, কখনো চিকিৎসার আশ্রয়ে দিন কাটছে তাঁর। পাশে নেই কোনো পরিচিত মুখ, নেই নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার মতো স্বজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এই বৃদ্ধার এমন অসহায় পরিস্থিতি মানুষের পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সহমর্মিতার বিষয়টিকেও নতুন করে সামনে এনেছে।

বৃদ্ধার ডাকনাম ফুলি। বয়স আনুমানিক ৭০ বছরের বেশি। অসুস্থতার কারণে তিনি নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে জানাতে পারছেন না। গত শুক্রবার রাতে তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। এর আগে সরাইলের গরুর বাজার এলাকায় অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলেন তিনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, পানি, চাটাই ও বালিশসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন আপনজনের উপস্থিতি। অসুস্থ অবস্থায় একজন বৃদ্ধ মানুষের পাশে শুধু ওষুধ বা খাবার নয়, মানসিক নিরাপত্তা ও পরিচর্যার জন্যও একজন দায়িত্বশীল স্বজনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তাঁর পাশে পরিবারের কাউকে দেখা যায়নি।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল জব্বারের ভাষ্য অনুযায়ী, সরাইলের গরুর বাজার এলাকায় একজন অসুস্থ নারী পড়ে আছেন—এমন খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। পরে ওই নারীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তাঁর বাড়ি সরাইল সদরের উচালিয়াপাড়া গ্রামে বলে জানা গেছে। তাঁর একটি ছেলে রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ছেলেটির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলে বৃদ্ধার বর্তমান পরিস্থিতি, তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি কীভাবে জীবনযাপন করছিলেন—এসব বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁর পরিবার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

একজন বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব বৃদ্ধ মানুষ নিজের পরিচয় বা ঠিকানা পরিষ্কারভাবে বলতে পারেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিবার শনাক্ত করা এবং নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আরও জটিল হয়ে পড়ে। ফুলি নামের এই বৃদ্ধার ক্ষেত্রেও এখন সেই চ্যালেঞ্জই সামনে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃদ্ধার সন্তান বা পরিবারের কোনো স্বজন দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না এলে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সুস্থ হওয়ার পর তাঁর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করারও চেষ্টা করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আজাহার উদ্দিন জানান, বৃদ্ধার পরিবারের কেউ দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না এলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হবে। পরে তাঁর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বৃদ্ধার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়, বরং সমাজে বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্বের প্রশ্নও সামনে এনেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক জটিলতার কারণে প্রবীণদের জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। তখন পরিবারই সাধারণত তাঁদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কোনো কারণে সেই আশ্রয় অনুপস্থিত হলে একজন অসহায় বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার জন্য পরিস্থিতি দ্রুত সংকটময় হয়ে উঠতে পারে।

ফুলির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া। তিনি কোথায় থাকতেন, তাঁর ছেলে কোথায় আছেন, তিনি কতদিন ধরে অসুস্থ এবং কী পরিস্থিতিতে গরুর বাজার এলাকায় এসে পড়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেলে বৃদ্ধার অতীত জীবন ও পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। পরিবারের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া গেলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃদ্ধার ভবিষ্যৎ পরিচর্যা ও নিরাপত্তার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। আর যদি কোনো স্বজনকে পাওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে সমাজসেবা বা সংশ্লিষ্ট মানবিক সংগঠনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন হতে পারে।

হাসপাতালের একটি বিছানায় অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকা এই বৃদ্ধার পাশে এখন পর্যন্ত যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের উদ্যোগ অন্তত সাময়িকভাবে তাঁর একাকিত্ব কমিয়েছে। খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। একজন প্রবীণ মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক যত্ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ফুলির মতো পরিচয়হীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রবীণদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পরিবার শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয় দ্রুত নিশ্চিত করা গেলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমতে পারে।

সন্তান থাকার পরও একজন বৃদ্ধা কেন এমন অবস্থায় পড়লেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তাই কোনো পক্ষকে দায়ী করার আগে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য জানা জরুরি। তবে যে বাস্তবতা এখন সামনে রয়েছে, তা হলো—অসুস্থ ও অসহায় একজন প্রবীণ নারী হাসপাতালের বিছানায় একা। তাঁর চিকিৎসা চলছে, কিছু মানুষ সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন, আর স্থানীয় পর্যায়ে পরিবারের সন্ধানের চেষ্টা চলছে।

জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা, যত্ন ও মর্যাদা। ফুলি নামের এই বৃদ্ধার ক্ষেত্রেও সেই মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। পরিবারকে খুঁজে পাওয়া গেলে তাঁর স্বজনদের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর তা সম্ভব না হলে সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগেই তাঁর জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত