এআই নিয়ন্ত্রণে আইন চান বিল গেটস, বড় বিপদের শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
এআই নিয়ন্ত্রণে আইন চান বিল গেটস, বড় বিপদের শঙ্কা

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অপব্যবহার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এই বাস্তবতায় মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এআই নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় সরাসরি যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের হাতে গেলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, যার পরিণতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। এমনকি তিনি বলেছেন, এআই এমন ঘটনাও ঘটাতে সক্ষম হতে পারে, যাতে এক বিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।

রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এ সতর্কবার্তা দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নীতিমালা বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকেও নিরাপত্তা, নজরদারি ও জবাবদিহির জন্য বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

তবে গেটসের বক্তব্যকে এমন কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখা ঠিক হবে না যে এআই একদিন অবশ্যম্ভাবীভাবে এক বিলিয়ন মানুষের প্রাণ নেবে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার পূর্বাভাস দেননি। বরং তাঁর আশঙ্কার কেন্দ্র হলো এআইয়ের শক্তি এবং সেই শক্তি যদি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা কতটা বড় হতে পারে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের সক্ষমতা এখন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, যা অতীতে কেবল রাষ্ট্র বা বড় সংগঠনের হাতে থাকা কিছু ক্ষমতাকে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য করে দিতে পারে।

গেটসের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এআই নিজে নয়; বরং এআইয়ের শক্তিশালী সরঞ্জাম কার হাতে যাচ্ছে এবং তারা কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করছে। তাঁর বক্তব্যে সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল করে দেওয়া এবং জৈবিক ঝুঁকির মতো বিষয় উঠে এসেছে। উন্নত এআই যদি ক্ষতিকর ব্যক্তিদের জ্ঞান, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আগের তুলনায় কম সম্পদ ব্যবহার করেও বড় ধরনের ক্ষতি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাই তিনি তুলে ধরেছেন।

এ কারণেই এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা পরীক্ষাকে শুধু প্রযুক্তি তৈরির শেষ ধাপ হিসেবে না দেখে শুরু থেকেই নজরদারি ও মূল্যায়নের আওতায় আনার পক্ষে গেটস। তাঁর মতে, এআই কোম্পানিগুলোর ওপর কিছু অতিরিক্ত নিরাপত্তা দায়িত্ব আরোপ করলে শিল্পখাতে কিছু ব্যয় বাড়তে পারে। তবে এই ধরনের ব্যবস্থা এআই উন্নয়নের গতি নাটকীয়ভাবে থামিয়ে দেবে—এমনটি তিনি মনে করেন না। বরং তাঁর যুক্তি হলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগে থেকেই শক্তিশালী করা গেলে প্রযুক্তির সুফল ধরে রেখেও বড় ঝুঁকিগুলো কমানোর সুযোগ থাকবে।

এআই নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি মুহূর্তে প্রযুক্তি বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা বা ‘কিল সুইচ’ থাকলেই যথেষ্ট হবে না বলেও মত দিয়েছেন গেটস। তাঁর মতে, কোনো সিস্টেম বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর সেটি বন্ধ করার চেষ্টা করার চেয়ে তার আচরণ শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর। বিশেষ করে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো কীভাবে কাজ করছে, কী ধরনের নির্দেশনা অনুসরণ করছে এবং কোনো অস্বাভাবিক আচরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের প্রশ্নে গেটস সরাসরি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও আলোচনায় থাকতে হবে। কারণ এআইয়ের ঝুঁকি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার মতো বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে কিছু সতর্কতাকে অতিরঞ্জিত বা ‘হোক্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং প্রযুক্তির উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এমন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে গেটস বলেছেন, এআইয়ের অস্তিত্বগত বা বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতাকে তিনি হোক্স মনে করেন না। তিনি মনে করেন, নীতিনির্ধারকদের প্রযুক্তির সর্বশেষ সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে জানানো প্রয়োজন।

এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকি, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকট নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন।

গেটসের মতে, এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করা পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সময়কার সহযোগিতার চেয়েও কঠিন হতে পারে। এর একটি কারণ হলো এআই একই সঙ্গে সামরিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রযুক্তি। পরমাণু অস্ত্রের মতো কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ না থাকায় এআইয়ের উন্নয়ন, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দেশগুলোর স্বার্থও অনেক বেশি বিস্তৃত। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে একমত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করাও জটিল।

এআই নিয়ে গেটসের উদ্বেগ অবশ্য শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মসংস্থানের ওপর প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। আগস্টে প্রকাশিত এক দীর্ঘ লেখায় তিনি এমন কিছু কাজকে ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ বা মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে কিছু কাজ এআই বা রোবট প্রযুক্তিগতভাবে করতে পারলেও সামাজিক, মানবিক বা অর্থনৈতিক কারণে সেগুলো পুরোপুরি যন্ত্রের হাতে তুলে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

শিশু পরিচর্যা ও জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালনের মতো কাজের উদাহরণ দিয়ে গেটস বোঝাতে চেয়েছেন, সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই শেষ কথা হওয়া উচিত নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে পারে, কিন্তু মানুষের ভূমিকা পুরোপুরি সরিয়ে না দিয়ে এআইকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর এই ধারণায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে—কোন কাজ মানুষ করবে এবং কোন কাজ মেশিন করবে, সেই সীমারেখা ভবিষ্যতে কে এবং কীভাবে নির্ধারণ করবে।

কর্মসংস্থান রক্ষার আলোচনায় গেটস করব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও বলেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মী নিয়োগের তুলনায় যন্ত্র বা রোবট ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ধরনের কর সুবিধা তৈরি হয়। ফলে অর্থনৈতিক কাঠামো কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানুষকে যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি রোবট বা এআই ব্যবহারের ওপর কর আরোপের ধারণা তুলে ধরেছেন, যার মাধ্যমে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অর্থায়ন করা যেতে পারে।

তবে এআই নিয়ে গেটসের অবস্থানকে শুধু আশঙ্কা বা নিয়ন্ত্রণের দাবি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিতে এআইয়ের সম্ভাব্য ইতিবাচক ব্যবহার নিয়েও জোর দিয়ে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বের দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ফাউন্ডেশন এআইভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়ন এবং কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া ভাষাগুলোর জন্য আরও কার্যকর প্রযুক্তি তৈরির উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।

অর্থাৎ বিল গেটসের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এআইকে একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে; অন্যদিকে যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া একই প্রযুক্তি সাইবার অপরাধ, জৈবিক ঝুঁকি, অবকাঠামোগত বিপর্যয় এবং কর্মসংস্থানের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গেটস এআই উন্নয়ন বন্ধ করার আহ্বান জানাননি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সমান্তরালে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করা। তাঁর মতে, কোনো বড় বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক চলছে, বিল গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কতা সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা সহজ করবে, আর একই সঙ্গে কতটা নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে—তার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই। তবে এআইয়ের ক্ষমতা যত বাড়ছে, সেই ক্ষমতার ব্যবহার, নজরদারি এবং জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেই প্রশ্নটি ক্রমেই আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত