দুই সপ্তাহ আগেই কেশবপুরের পূজা মণ্ডপে উৎসবের আবহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৭ বার
দুই সপ্তাহ আগেই কেশবপুরের পূজা মণ্ডপে উৎসবের আবহ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোরের কেশবপুরে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি। আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। তবে তার আগেই উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেখা দিয়েছে উৎসবের আবহ। প্রতিমা নির্মাণ, রং-তুলির কাজ, মণ্ডপ সাজানো এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী, কারিগর ও পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা।

প্রতিবছরের মতো এবারও কেশবপুরে দুর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ। তবে এবারের আয়োজনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গত বছরের তুলনায় উপজেলায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর যেখানে ৯১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এবার সেখানে ১০১টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে পূজাকে ঘিরে প্রস্তুতির পরিধিও বেড়েছে।

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় প্রতিমা নির্মাণের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও কোথাও লেপনের কাজও শেষ করে শিল্পীরা এখন রং-তুলির কাজে ব্যস্ত। প্রতিমার অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটির কাঠামো পরিণত হচ্ছে দেবী দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিমায়। সামনে সময় খুব বেশি না থাকায় দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে প্রতিমা শিল্পীদের।

এবার কেশবপুর পৌরসভায় আটটি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। ত্রিমোহিনী ইউনিয়নে রয়েছে একটি মণ্ডপ। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নে ১৬টি, মজিদপুর ইউনিয়নে সাতটি, বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নে চারটি, মঙ্গলকোট ইউনিয়নে ছয়টি, কেশবপুর সদর ইউনিয়নে সাতটি, পাঁজিয়া ইউনিয়নে নয়টি, সুফলাকাটি ইউনিয়নে ১১টি, গৌরীঘোনা ইউনিয়নে ১২টি, সাতবাড়িয়া ইউনিয়নে ১২টি এবং হাসানপুর ইউনিয়নে আটটি মণ্ডপে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের মালোপাড়ায় এবার প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। নতুন এই পূজামণ্ডপকে ঘিরে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের আয়োজন হওয়ায় মণ্ডপ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে প্রতিমা নির্মাণ ও পূজার অন্যান্য আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের ব্যস্ততাও বেড়েছে।

মালোপাড়া পূজামণ্ডপ কমিটির সভাপতি অসীম বিশ্বাস জানান, এলাকায় এবার প্রথমবার দুর্গাপূজার আয়োজন হওয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। নতুন মণ্ডপে পূজার আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে এবং সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতিতে অংশ নিচ্ছেন।

কেশবপুর কালীবাড়ি মন্দিরেও চলছে প্রতিমা নির্মাণের ব্যস্ততা। খুলনার কপিলমনি এলাকার প্রতিমা শিল্পী প্রহ্লাদ বিশ্বাস সেখানে দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণ করছেন। শুধু কেশবপুর নয়, এবছর যশোরের বিভিন্ন এলাকা, খুলনার কপিলমনি ও সাতক্ষীরাসহ মোট সাতটি স্থানে প্রতিমা নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন আরও পাঁচজন।

প্রহ্লাদ বিশ্বাস জানান, কেশবপুর কালীবাড়িতে প্রতিমার মাটির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন চলছে রং-তুলির কাজ। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রতিমায় রং করার কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পূজার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করতে তাঁকে এবং তাঁর সহযোগীদের টানা পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

প্রতিমা তৈরির এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিল্পীদের জীবনের বাস্তবতাও খুব সহজ নয়। প্রহ্লাদ বিশ্বাসের ভাষায়, সহযোগী ভাস্কর্য শ্রমিকদের পারিশ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর পর যা থাকে, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়। উৎসবের সময় তাঁদের কাজের চাপ বাড়লেও আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবু বছরের এই সময়টিতে মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগই তাঁদের কাজের বড় প্রেরণা।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেশবপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুকুমার সাহা জানান, এবার উপজেলার ১০১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। এখন রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে প্রতিমাগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। গত বছর কেশবপুরে ৯১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে ১০১টিতে দাঁড়িয়েছে।

পূজাকে ঘিরে শুধু প্রতিমা নির্মাণই নয়, মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পূজার সামগ্রী সংগ্রহ, দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশ প্রস্তুত করা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতিও ধীরে ধীরে শুরু হচ্ছে। পূজার দিন যত এগিয়ে আসবে, মণ্ডপগুলো তত বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। এখন যে মণ্ডপগুলোতে নির্মাণকাজের ব্যস্ততা, কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো রং, আলো ও সাজসজ্জায় উৎসবের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

কেশবপুর কালীবাড়ি মন্দির কমিটির সভাপতি পঙ্কজ দাস জানান, তাঁদের মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিতে এবার প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। পূজার পুরো আয়োজন শেষ করতে মোট ব্যয় হতে পারে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। তিনি বলেন, স্থানীয় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন করার প্রত্যাশা রয়েছে।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে প্রশাসন। কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, পূজার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, আনসার ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থাও থাকবে।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহু মানুষের কাছে সামাজিক মিলন, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। কেশবপুরে পূজার প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই মণ্ডপগুলোকে ঘিরে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। প্রতিমা শিল্পীর তুলির আঁচড়, কারিগরদের ব্যস্ততা এবং আয়োজকদের নানা প্রস্তুতি মিলিয়ে এরই মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।

মহালয়ার পর দেবীপক্ষ শুরু হলে এই আবহ আরও বিস্তৃত হবে। ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার আগেই কেশবপুরের ১০১টি মণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় রংয়ের কাজ, কোথাও মণ্ডপ সাজানোর পরিকল্পনা, আবার কোথাও নতুন করে পূজার আয়োজনকে ঘিরে মানুষের উৎসাহ—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবের অপেক্ষা যেন আগেই পৌঁছে গেছে কেশবপুরের জনপদে। নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই আয়োজন সম্পন্ন হলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্রও আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত