হাম-উপসর্গে হাজার মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
হাম-উপসর্গে হাজার মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে হামের উপসর্গ ও হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ১০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ১৫৯ জন। এ ছাড়া নতুন করে ৯৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০১ জন। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেছেন আরও ৯৯৮ জন। ফলে হাম ও এর উপসর্গ ঘিরে দেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টার তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে নতুন করে মৃত্যুবরণ করা তিনজনের মধ্যে দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অপর একজন সিলেট বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে কোনো এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়ে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৯ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ২১ হাজার ৩০৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ হামের মতো উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে গেছেন, যদিও তাদের সবার ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে এমন নয়।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানে বিভাগভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত ৪৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর রয়েছে সিলেট বিভাগ, যেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৬। রাজশাহী বিভাগে ৯৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, বরিশাল বিভাগে ৬০ জন, খুলনা বিভাগে ৪৪ জন এবং রংপুর বিভাগে ১৫ জন মারা গেছেন।

বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষের সংখ্যা এক নয়। কোথাও রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি, আবার কোথাও মৃত্যুর সংখ্যা অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা, রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে আসার প্রবণতা, চিকিৎসা পাওয়ার সময় এবং স্থানীয় পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কোনো একটি কারণকে মৃত্যুর জন্য দায়ী করা যায় না।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যেও ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে। এই সময়ে ঢাকায় ৪০৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ২৭৫ জন, সিলেটে ১৬৪ জন, বরিশালে ১৩০ জন, খুলনায় ৭৮ জন, ময়মনসিংহে ৬৮ জন, রাজশাহীতে ২৮ জন এবং রংপুর বিভাগে ১২ জন।

এক দিনে এক হাজারের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের পর্যবেক্ষণ ও সেবা দেওয়ার প্রয়োজন থাকায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা এবং শয্যার ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। গুরুতর অবস্থায় দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো টিকাদান। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করা হলে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে। তবে টিকাদানের পাশাপাশি রোগী শনাক্তকরণ, নজরদারি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিলে তাকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নিজেরা চিকিৎসা না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি আরও একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। সব জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগী হাম আক্রান্ত নাও হতে পারেন। ফলে উপসর্গের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানেও হাম শনাক্ত রোগী এবং হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে নতুন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, হামের উপসর্গজনিত রোগীর চাপ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে এ পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৯-এ পৌঁছানোয় পরিস্থিতিটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষায় পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের সংখ্যা কমাতে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমিত ব্যক্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন এলাকায় সংক্রমণ বা উপসর্গ বেশি ছড়াচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

একদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের সচেতনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। হাম আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। জনসচেতনতা, টিকাদান ও দ্রুত চিকিৎসার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত