প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ঘিরে উপাচার্য পদে পরিবর্তনের বিরোধিতা করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সপ্তম দিনেও অব্যাহত রয়েছে। টানা আন্দোলন ও সর্বাত্মক শাটডাউনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকার পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যেই দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা কখনও ক্রিকেট খেলে, কখনও সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজন করে, আবার কখনও প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
আন্দোলনকারীদের মূল দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করতে হবে। গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে উপাচার্য পদ থেকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই সময়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে তা ধীরে ধীরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের অংশগ্রহণে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
সোমবারও শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমও চালু করা যায়নি। উপাচার্যের কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা গেছে। দরজায় সাঁটানো একটি নোটে লেখা রয়েছে, ‘এই তালা শুধু সায়েম স্যার খুলতে পারবেন।’ আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
তবে আন্দোলনের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি ও মানবিক সেবাগুলো চালু রাখার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তা শাখা ও চিকিৎসাকেন্দ্রসহ জরুরি সেবাগুলো সর্বাত্মক শাটডাউনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে একদিকে আন্দোলনের কর্মসূচি চললেও অন্যদিকে প্রয়োজনীয় মানবিক সেবা সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সোমবার আন্দোলনের ধরনেও ছিল ভিন্নতা। চুয়েটের প্রধান ফটকে ক্রিকেট পিচ তৈরি করে আয়োজন করা হয় ‘৫৬ বল শর্ট পিচ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’। সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সায়েমের ৫৬ দিনের দায়িত্বকালকে স্মরণ করে এই প্রতীকী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলনে মিছিল, সমাবেশ বা অবস্থান কর্মসূচি দেখা গেলেও চুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ ক্যাম্পাসের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শুধু ক্রিকেট নয়, শিক্ষার্থীরা প্রতীকীভাবে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে সাদা শাড়িতে মার্কার দিয়ে অধ্যাপক সায়েমের উপাচার্য হিসেবে কার্যক্রম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথাও লিখেছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা সাবেক উপাচার্যের দায়িত্বকালের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
সন্ধ্যায় চুয়েটের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বড় পর্দায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। পরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের ওপর বিভিন্ন মহল থেকে চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হলেও অংশগ্রহণকারীদের ওপর কোনো ধরনের চাপ বা ভয়ভীতি গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চুয়েটের অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাঁদের দাবির সঙ্গে একাত্ম। শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, তাঁদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই তাঁরা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন।
একই বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি কামনা করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থার একটি সমাধান বের করা হবে। পাশাপাশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিভিন্নভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ, নজরদারি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশ ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের পক্ষ থেকেও আন্দোলন ঘিরে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাঁর দাবি, শিক্ষকরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে অংশ নিতে এবং কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য করেছেন। তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মইনুল ইসলাম। তিনি এটিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট দাবি করে কর্মকর্তা-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বললে প্রকৃত পরিস্থিতি জানা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন।
অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সরকারকে আন্দোলনরত শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের যেন আর একটি দিনও নষ্ট না হয়, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে এখনো সংলাপে বসার কোনো আহ্বান আসেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা আচার্যের দপ্তর—কোনো পক্ষ থেকেই শিক্ষক সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। নতুন উপাচার্যের সঙ্গেও তাঁদের আলোচনা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি। টানা ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষক সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, অতীতেও সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নজির রয়েছে। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে দুটি ব্যাচ একসঙ্গে চালানোর উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি কভিড-পরবর্তী সময়ে শুক্রবার ও শনিবার অতিরিক্ত ক্লাস নিয়েও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তবে চলমান পরিস্থিতিতে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের এ বছরই পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও সংকট অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে তাঁদের স্নাতক সম্পন্ন হতে পারে বলে শিক্ষক সমিতির সভাপতি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে আন্দোলনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারও কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। মুখোশ মিছিল, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দাবি তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে সর্বাত্মক শাটডাউনও চলবে। তবে জরুরি ও মানবিক সেবাগুলো সচল রাখার অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান—সব মিলিয়ে সংকট জটিল হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সময়সূচি, শিক্ষক ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রশ্ন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমান্তরালে চলার কথা। কিন্তু চুয়েটে টানা সাত দিনের অচলাবস্থা সেই স্বাভাবিক ধারায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। আন্দোলনের প্রতিটি দিন যেমন দাবি আদায়ের চাপ বাড়াচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে। এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ শুরু হয় কি না এবং আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত কোনো সমাধানের পথ বের করা যায় কি না—সেদিকেই নজর রয়েছে চুয়েটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।