হবিগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
হবিগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজারগামী বাস আটকে ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিবাদে হবিগঞ্জ জেলায় অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর সকাল থেকে এ ধর্মঘট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মঘট চলাকালে হবিগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা।

হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-শেরপুর-সিলেট রুটে পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন তারা। কিন্তু এই রুটে বাস চলাচলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুই জেলার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। একাধিকবার বৈঠক ও সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে আবারও বিরোধ দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

পরিবহন মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে মৌলভীবাজার জেলার মালিক-শ্রমিকদের একটি পক্ষ হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধা দিতে শুরু করে। এ নিয়ে দুই জেলার পরিবহন খাতে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে জাতীয় সংসদের তৎকালীন হুইপ জি.কে. গউছের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আলোচনার পর হবিগঞ্জের বাসগুলো আগের মতো সংশ্লিষ্ট রুটে চলাচল করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

তবে সেই সমঝোতার পরও বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে পরিবহন মালিকদের দাবি। তাদের অভিযোগ, চলতি বছরের ১০ মে কোনো ধরনের পূর্ব যোগাযোগ ছাড়াই মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে শেরপুর এলাকায় হবিগঞ্জের একটি বাস আটকে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই জেলার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয় এবং পরিবহন চলাচল ব্যাহত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সংশ্লিষ্ট রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হবিগঞ্জ থেকে সিলেট হয়ে মৌলভীবাজারের পথে আগের নিয়মে বাস চলাচল করার কথা ছিল। তবে শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জের বাস কোনো স্টপেজ দিতে পারবে না—এমন একটি শর্তও নির্ধারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এই সিদ্ধান্ত মেনে বাস চলাচল শুরু হওয়ার পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল বলেও তাদের দাবি।

কিন্তু পরে আবারও নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়। পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, ১১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের ২২টি গাড়ি আটকে রাখা হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট রুটে বাস চলাচল আবারও বাধাগ্রস্ত হয়। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গাড়ি আটকে দেওয়ার ঘটনায় দুই জেলার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে বলে দাবি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি সমাধানে ঢাকায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি মীমাংসা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিবহন মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিরোধের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও ঘটনাটি নতুন করে সামনে আসে। এর ধারাবাহিকতায় বাস আটকে রাখা, ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে এবার কঠোর কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছে হবিগঞ্জের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো।

হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, তাদের পরিবহন দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট সড়কে নিয়মিত যাত্রীসেবা দিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে বাধার কারণে শুধু পরিবহন মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সাধারণ যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের দিকে নিয়মিত যাতায়াতকারী চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য এ ধরনের বিরোধ বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি করে।

পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হবিগঞ্জ থেকে সিলেট ও মৌলভীবাজারমুখী সড়ক যোগাযোগ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এসব রুটে চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে মানুষ যাতায়াত করেন। হঠাৎ করে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বিকল্প পরিবহন খুঁজতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।

দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ থাকলে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যারা আগে থেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন বা জরুরি প্রয়োজনে জেলার বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। পরিবহন ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাস চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং একাধিক সমঝোতার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে গাড়ি আটকে রাখা এবং শ্রমিকদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের ঘটনায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পরিবহন পরিচালনা করা কঠিন বলে মনে করছেন তারা।

তবে এ ধরনের আন্তঃজেলা পরিবহন বিরোধের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শুধু সাময়িক বৈঠক বা সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করে কোন রুটে কোন পরিবহনের চলাচল থাকবে, কোথায় বাস থামতে পারবে, মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব কী এবং কোনো পক্ষ নিয়ম ভঙ্গ করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষ যেন জিম্মি না হন, সে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো বাস আটকে দেওয়া, ভাঙচুর কিংবা শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

হবিগঞ্জে ঘোষিত ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত কতদিন চলবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন করে সমঝোতা হয় কি না তার ওপর। প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো দ্রুত আলোচনায় বসতে পারলে জনদুর্ভোগ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যথায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনেও এর চাপ পড়তে পারে।

বর্তমানে হবিগঞ্জের পরিবহন খাতে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল ও মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। একাধিক বৈঠক ও সিদ্ধান্তের পরও যদি একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটে, তাহলে স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে প্রশাসনের উদ্যোগে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানই সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন খাত—উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হবিগঞ্জে আগামীকাল সকাল থেকে ঘোষিত সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটের ফলে জেলার সড়ক যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকবে বলে পরিবহন নেতারা জানিয়েছেন। ফলে ধর্মঘটের আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট রুটের যাত্রীদের যাতায়াত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। এখন নজর থাকবে প্রশাসনের উদ্যোগ এবং দুই জেলার পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com