আদাবরে বাড়ি দখল মামলায় গ্রেপ্তার বেড়ে ১০

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
আদাবরে বাড়ি দখল মামলায় গ্রেপ্তার বেড়ে ১০

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশের গুলিতে দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় চাপাতি, সামুরাই ও কিরিচসহ কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকার কাঁচাবাজারসংলগ্ন মেলার মাঠের পেছনে খালপাড়ের একটি ফাঁকা জায়গায় কয়েকজন আসামি অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। আদাবর থানার একটি দল সেখানে পৌঁছালে পুলিশ সদস্যরা সাত থেকে আটজনকে দেখতে পান। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

অভিযানসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আসামিরা চাপাতি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা করলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ গুলি ছোড়ে। কনস্টেবল মোশরেকুল ইসলাম তাঁর শটগান থেকে দুই রাউন্ড গুলি করেন। এতে রাজিব হাওলাদার ও সাগর ওরফে ছোট বিগার নামে দুজন পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাদের চিকিৎসার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

অভিযানের সময় চারজনকে আটক করা সম্ভব হলেও অন্য কয়েকজন সেখান থেকে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ গ্রেপ্তার চারজন হলেন রাজিব হাওলাদার, সাগর ওরফে ছোট বিগার, শাকিব ও রাশেদ। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে রাজিব মোহাম্মদপুরের একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি। সাগরের বিরুদ্ধে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানায় মোট আটটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শাকিব ও রাশেদের বিরুদ্ধে পাঁচটি করে মামলা রয়েছে বলেও পুলিশ দাবি করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা জানান, আদাবরে ভাঙচুরের ঘটনায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর একটি মামলা করা হয়। ওই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নবোদয় হাউজিং এলাকার ওই স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা হামলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোড়া হয় বলে তিনি জানান।

ঘটনার পর আহত দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। পুলিশ বলছে, অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থল থেকে চাপাতি, সামুরাই ও কিরিচ উদ্ধার করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তারা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

অপরাধী চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তথ্য যাচাই করে তাদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা এবং আদালতে তা প্রমাণিত হওয়ার বিষয় দুটি পৃথক—এ কারণে মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন, এই ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। একই সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধার, হামলার অভিযোগ এবং পুলিশের গুলির ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকার একটি বাড়ি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে। পুলিশের কাছে করা অভিযোগ অনুযায়ী, গত রোববার ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল ওই বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তাদের হাতে চাপাতি, রামদা ও পিস্তল ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। হামলার সময় বাড়িতে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। পরে এ ঘটনায় আদাবর থানায় মামলা করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িটির মালিকানা নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। সেই বিরোধের জেরেই বাড়ি দখলের চেষ্টা, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

রাজধানীর আবাসিক এলাকায় বাড়ি বা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে কোনো বিরোধে অস্ত্রের ব্যবহার বা সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা দেখা দেয়। আদাবরের এই ঘটনাতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

এদিকে পুলিশের অভিযানের সময় গুলি ছোড়ার ঘটনায়ও আইনগত ও প্রক্রিয়াগত বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, সদস্যদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার চেষ্টা হওয়ায় আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়া হয়েছে। গুলিতে আহত দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি অভিযানের সময় পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলির ঘটনাক্রমও যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার বিষয় রয়েছে।

মামলায় এর আগে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ চারজনসহ এখন পর্যন্ত মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজন পলাতক থাকায় তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা গেলে বাড়ি দখলের চেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা আগের মামলাগুলোর তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন মামলার অভিযোগ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এবং গুলির ঘটনার বিষয়টিও আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আদাবরের এই ঘটনায় একদিকে যেমন বাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান এবং অভিযানের সময় অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা, প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনি অধিকার এবং তদন্তের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

ঘটনার পর আদাবর ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পলাতক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং বাড়ি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা। মামলার পরবর্তী আইনগত কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এ ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত