কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। কন্যাশিশুর অধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্ব জয়’। কিন্তু অধিকার ও সম্ভাবনার কথা বলার এই দিনেই সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুর ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার একের পর এক ঘটনায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নথিভুক্ত মামলার তথ্যও পরিস্থিতির ওপর বাড়তি নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার বেশ কিছু ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ, চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, পাবনায় এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং আশুগঞ্জে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো পরিবারগুলোর নিরাপত্তাবোধকে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিটিই আলাদা এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আলাদাভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা। তবে ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় কন্যাশিশু ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট হত্যার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। বছরের প্রথম কয়েক মাসের তথ্যেও ১১৮ শিশুর ধর্ষণের শিকার হওয়ার এবং আরও ৪৬ শিশুর ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার কথা উঠে এসেছিল। ধর্ষণের পর ১৪ শিশুকে হত্যা এবং ধর্ষণচেষ্টার পর আরও তিন শিশুকে হত্যার ঘটনাও তখন নথিভুক্ত হয়েছিল। একই সময়ে যৌন সহিংসতার পর দুই শিশুর আত্মহত্যার তথ্যও সংস্থাটি উল্লেখ করে।

পরবর্তী সময়েও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এসব পরিসংখ্যান মূলত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও নথিভুক্ত ঘটনাভিত্তিক। ফলে বাস্তবে সংঘটিত সব ঘটনা এতে প্রতিফলিত হয় না। সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না বলে অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পর্যবেক্ষণেও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে নারী ও কন্যাশিশু হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, রহস্যজনক মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া এসব হিসাব পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে, যদিও এগুলোকে দেশের সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

শুধু পুলিশের কাছে মামলা হওয়া বা সংবাদমাধ্যমে ঘটনা প্রকাশের মধ্যেই সংকট সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের কাছ থেকেও সহায়তার আবেদন আসছে। বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে শিশু যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত হাজার হাজার কল আসার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত কলও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শিশু ও পরিবারের জন্য সহজলভ্য এবং নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকলে অনেক ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের নথিভুক্ত ধর্ষণ মামলার সংখ্যাও বিষয়টির গুরুত্ব সামনে আনে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ধর্ষণের অভিযোগে চার হাজারের বেশি মামলা রেকর্ড হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। তবে মামলা বৃদ্ধির অর্থ সব ক্ষেত্রেই অপরাধের প্রকৃত হার একই অনুপাতে বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগ জানানোর প্রবণতা, মামলা গ্রহণের প্রক্রিয়া, সামাজিক সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনও মামলার পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলতে পারে। তবু বিপুলসংখ্যক অভিযোগ শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে ধারাবাহিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো অপরাধী হিসেবে অনেক ঘটনায় পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটজনের নাম উঠে আসা। প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা শিশুর পরিচিত সামাজিক পরিসরের কেউ অভিযোগের মুখে পড়লে পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বাইরে সতর্কতা নয়, ঘর ও পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ সম্পর্ক ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

মানবাধিকারকর্মীরা কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার পেছনে একাধিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণের কথা বলছেন। পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতার ঘাটতি এবং অপরাধের পর দ্রুত ও কার্যকর বিচার না হওয়ার ধারণা—এসব বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে তাঁদের মত। তবে কোনো একটি কারণকে সব ধরনের অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; প্রতিটি ঘটনার পেছনের বাস্তবতা আলাদাভাবে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন অধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তাদের মতে, শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না; বিদ্যমান আইন প্রয়োগ, তদন্তের মান, ভুক্তভোগী ও পরিবারের সুরক্ষা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ যাতায়াত, অভিযোগ জানানোর নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অনলাইন জগতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০০০ সালে। কন্যাশিশুর শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে কন্যাশিশুর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি জাতীয় নীতি ও বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের সুরক্ষা, বিকাশ ও অধিকার নিশ্চিত করার নীতিগত স্বীকৃতি রয়েছে।

কিন্তু কাগজে অধিকার স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সেই অধিকার কার্যকর হওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। একটি কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ শৈশব মানে শুধু নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়া নয়; নিরাপদে স্কুলে যাওয়া, নিজের কথা বলার সুযোগ পাওয়া, বাল্যবিবাহ থেকে সুরক্ষিত থাকা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অধিকার পাওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করাও এর অংশ।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। একটি শিশুর জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, শিশুদের সচেতন করা এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের নয়। ঘর থেকে স্কুল, খেলার মাঠ থেকে অনলাইন পরিসর—প্রতিটি জায়গায় শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্ব জয়’—এ বছরের প্রতিপাদ্যের বাস্তব অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন প্রতিটি কন্যাশিশু ভয় নয়, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত