প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বদলে যাচ্ছে উৎপাদনব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ধরন। যে কাজ একসময় একাধিক শ্রমিকের হাতে সম্পন্ন করতে হতো, আধুনিক যন্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে সেই কাজ এখন তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে অটোমেশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও এর বিপরীত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা গেলে আগামী বছরগুলোতে বিপুলসংখ্যক পোশাক শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, অটোমেশনের প্রভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে পোশাক খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আশঙ্কা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নারীদের জন্য এই খাত দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে কাজ করছে। কারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এলে তাঁদের জীবিকা ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সিপিডির গবেষণায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, তৌফিকুল ইসলাম খান, মামতাজুল জান্নাত ও মালিহা রহমান। এতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রযুক্তি নিজে কর্মসংস্থানের জন্য একমাত্র হুমকি—গবেষণার বিষয়টি এমন সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অটোমেশন একই সঙ্গে কিছু কাজ কমিয়ে দিতে পারে এবং নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি করতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত কর্মবাজারে শ্রমিকেরা নিজেদের কতটা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারছেন এবং তাঁদের সেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কতটা তৈরি করা হচ্ছে।
এশিয়ার শ্রমবাজারেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় ‘এআইয়ের যুগে এশিয়ার শ্রমবাজার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা উপস্থাপনায় এ বিষয়ে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়। আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের অর্থনীতিবিদ দিব্যা কীর্তি গবেষণাটি উপস্থাপন করেন।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই গবেষণায় শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব এবং কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশায় এআই-সংশ্লিষ্ট দক্ষতার চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশার প্রায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে কিছু এআই-প্রভাবিত পেশায় নিয়োগের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। তবে এর অর্থ সামগ্রিক কর্মসংস্থান ১০ শতাংশ কমে যাওয়া নয়। বরং নিয়োগদাতাদের চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং কর্মীদের নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের পোশাকশিল্পেও পড়তে পারে। উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নির্দিষ্ট ধরনের কাজের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। বিপরীতে যন্ত্র পরিচালনা, উৎপাদনের মান যাচাই, তথ্য ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মতো কাজে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়তে পারে।
ফলে ভবিষ্যতের পোশাকশিল্পে শুধু প্রচলিত কাজের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নাও হতে পারে। শ্রমিকদের প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। মৌলিক এআই জ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিতি তাঁদের কর্মজীবনে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাবে না। বরং দক্ষ শ্রমিক ও কম দক্ষ শ্রমিকের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হওয়ার পেছনেও রয়েছে কর্মক্ষেত্রের কাঠামোগত বাস্তবতা। পোশাক কারখানায় বিপুলসংখ্যক নারী এমন উৎপাদন কাজে যুক্ত, যেখানে একই ধরনের কাজ বারবার করতে হয়। এসব কাজের একটি অংশ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তি পরিচালনা, উৎপাদন পরিকল্পনা কিংবা ব্যবস্থাপনার মতো তুলনামূলক দক্ষতার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির সুযোগ তাঁদের সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত নয়।
ফলে শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমানোর জন্য নয়, নারী শ্রমিকদের কর্মজীবনে উন্নতির সুযোগ তৈরির জন্যও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। একই কারখানায় একজন শ্রমিককে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে শ্রমবাজারের বাইরে চলে যাওয়ার পরিবর্তে নতুন দায়িত্বে স্থানান্তর করা সম্ভব হতে পারে।
এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি গ্রহণের আগে বা পাশাপাশি শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হলে অটোমেশনের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সরকার ও প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজাতে হবে।
যেসব শ্রমিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন, তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। কেবল প্রশিক্ষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশিক্ষণের পর সেই দক্ষতার ব্যবহার কোথায় হবে, কীভাবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং পরিবর্তনের সময় শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শ্রমিক দীর্ঘদিন একটি শিল্পে কাজ করার পর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়লে তাঁর আয় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে আগামী এক দশকে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ যখন প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তখন এআই ও অটোমেশনের দ্রুত বিস্তার নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। প্রযুক্তি একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলে অনেক তরুণ প্রচলিত কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিকে আটকে রাখার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য সমাধান হতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাকশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতেই হবে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে শ্রমিকদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ না থাকলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়লেও তার সুফল শ্রমিকসমাজের একটি বড় অংশের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশের জন্য তাই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন শুধু কত দ্রুত এআই ও অটোমেশন গ্রহণ করা যাবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কত দ্রুত দেশের শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির উপযোগী করে তোলা যাবে। একজন শ্রমিককে প্রযুক্তির কারণে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার পরিবর্তে প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে পারাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তৈরি পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি ও মানুষের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। আধুনিক যন্ত্র উৎপাদন বাড়াবে, কিন্তু সেই যন্ত্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষ মানুষ। তাই অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রশিক্ষণ, পুনঃদক্ষতা অর্জন, কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির সুযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
১২ লাখের বেশি চাকরি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ। প্রযুক্তির পরিবর্তন অনিবার্য হলেও সেই পরিবর্তনের মানবিক মূল্য কতটা হবে, তা নির্ভর করবে আজকের প্রস্তুতির ওপর। সময়মতো সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা গেলে এআই ও অটোমেশন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শুধু চাকরির ঝুঁকি নয়, বরং নতুন দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও উন্নত কর্মসংস্থানের পথও খুলে দিতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত