প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের যোগদানকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও অচলাবস্থা আরও তীব্র হয়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির মধ্যেই নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সোমবার সকালে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। এরপর তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ভবনের বিভিন্ন প্রবেশপথে তালা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাত পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন বলে জানা গেছে।
একই দিনে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসার পথে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে দুই দফা হামলার অভিযোগ ওঠে। বাস আটকে শিক্ষার্থীদের মারধর, হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরের প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন চুয়েটের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিরোধের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। এ সময় তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে রুটিন দায়িত্বে থাকা যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আরাফাত রহমান নতুন উপাচার্যের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। তবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এর আগে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশকে আন্দোলনকারীরা কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আরও জোরালো হয় এবং উপাচার্য ভবন ঘিরে অবস্থান শুরু হয়।
সকাল ১০টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের চারপাশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাঁরা ভবনের ভেতরের গেটগুলোতে তালা দেন এবং বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ভবনের প্রধান ফটকেও তালা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, নবনিযুক্ত উপাচার্যকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ জন্য দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি ভবন ত্যাগ না করলে ভবনটিকে ‘ভ্যাকেন্ট’ ঘোষণা করার হুঁশিয়ারিও দেন আন্দোলনকারীরা।
তবে উপাচার্য ভবন না ছাড়ায় সেখানে তালা বহাল রাখা হয়। প্রতিবেদন তৈরির সময় রাত ১০টা পর্যন্ত অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ ছিলেন বলে জানা যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে এভাবে অবরুদ্ধ রাখার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুতর দিক তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় নিরাপত্তা, মানবিক বিবেচনা এবং সংকট নিরসনের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম শিক্ষার্থীদের প্রতি সহনশীল থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ ও পানির মতো সেবা বন্ধ না রাখলে ভালো হয়। তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনার একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে তাঁদের সমিতির প্রতিনিধিরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তাঁরা জানান, নতুন উপাচার্যের আগমনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে কোনো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায়ভার নবনিযুক্ত উপাচার্যের ওপর বর্তাবে। তাঁদের বক্তব্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি উঠে আসে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে দুই দফা হামলার অভিযোগ ওঠার পর বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে মাঠে নামেন। বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে তাঁরা বাস আটকে শিক্ষার্থীদের মারধর, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার প্রতিবাদ জানান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করার বিষয়টিও তাই গুরুত্ব পাচ্ছে।
মানববন্ধনে চুয়েটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও চুয়েটের বাসে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁরা সেই ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে। তবে হামলার অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা, কারা এতে জড়িত এবং এর পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
চুয়েটের এই অচলাবস্থা কেবল উপাচার্যের পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষার মতো ব্যবহারিক ও গবেষণানির্ভর ক্ষেত্রে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে তার প্রভাব পরবর্তী সময়েও পড়তে পারে।
এ ধরনের সংকটের সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শোনা, দাবিগুলো পর্যালোচনা করা এবং আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবাদ জানানোর অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কারও নিরাপত্তা বিপন্ন না করা এবং জরুরি সেবা বন্ধ করে মানবিক ঝুঁকি তৈরি না করাও সমান জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষকে এককভাবে দায়ী না করে ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চুয়েটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার অভিযোগের তদন্ত, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ প্রয়োজন। উপাচার্যের পদ নিয়ে বিরোধের দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়েই সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত