৩৭ ঘণ্টার লড়াই শেষে চকবাজারের আগুন পুরোপুরি নিভল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯ বার
৩৭ ঘণ্টার লড়াই শেষে চকবাজারের আগুন পুরোপুরি নিভল

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে মনসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রায় সাড়ে ৩৭ ঘণ্টা পর আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সক্ষম হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের একটানা চেষ্টা করতে হয়েছে। ভবনের ভেতরে বিপুল পরিমাণ দাহ্য ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত থাকা, গুদামের দরজা ও শাটার তালাবদ্ধ থাকা, সরু সড়ক এবং পর্যাপ্ত পানির উৎস নিশ্চিত করার জটিলতার কারণে আগুন নেভানোর কাজ দীর্ঘায়িত হয়।

বুধবার ১৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোলরুম কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার নিশ্চিত করেন। এর আগে সোমবার ১২ অক্টোবর বিকেল ৫টা ২ মিনিটের দিকে চকবাজারের ছোট কাটরা এসি মসজিদসংলগ্ন একটি মার্কেটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে।

আগুনের তীব্রতা ও ভবনের ভেতরের পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে একে একে আরও ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের মোট ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাপণ কার্যক্রমে অংশ নেয়। শুরুতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চললেও দীর্ঘ সময় ধরে ভবনের বিভিন্ন অংশে আগুন জ্বলতে থাকায় পুরোপুরি নির্বাপণ করতে বিপুল সময় লেগে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, মার্কেটটির ষষ্ঠ তলায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের গুদাম ছিল। এসব গুদামের বেশ কয়েকটি দরজা ও শাটার তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকায় আগুনের মূল উৎসে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রথমে তালা ও শাটার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এরপর গুদামের ভেতরে থাকা পণ্য ও বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া আগুন মোকাবিলা করতে হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আগুন শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গুদামে থাকা পণ্যের ধরন, মজুতের ঘনত্ব এবং বাতাস চলাচলের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আগুন দ্রুত এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভবনের বিভিন্ন অংশে আগুনের তাপ ও ধোঁয়া জমে থাকায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সতর্কতার সঙ্গে একাধিক দিক থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হয়েছে।

চকবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সড়কের সংকীর্ণতা। পুরান ঢাকার বহু এলাকায় ভবন, দোকান, মার্কেট ও গুদাম পাশাপাশি অবস্থিত। এর সঙ্গে রয়েছে সরু রাস্তা ও যানবাহনের চাপ। ফলে বড় আকারের অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আগুনের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে পানি পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

এই আগুনের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ফায়ার সার্ভিসের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, পানির সীমিত উৎস এবং সরু রাস্তার কারণে পানিবাহী গাড়ি নিয়ে কাজ করতে সমস্যা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নেভানোর পাশাপাশি ভবনের অন্যান্য অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেও সদস্যদের কাজ করতে হয়েছে।

একটি অগ্নিকাণ্ড যখন দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকে, তখন শুধু আগুনের শিখা নেভানোই শেষ কাজ নয়। ভবনের ভেতরে কোথাও আগুনের তাপ বা ছোট ছোট আগুনের উৎস রয়ে গেছে কি না, তা শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গুদামজাত পণ্যের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে থাকলে বাইরে থেকে আগুন নিভে গেছে মনে হলেও ভেতরে তাপ বা আগুনের অস্তিত্ব থাকতে পারে। এ কারণেই ফায়ার সার্ভিসকে দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনাস্থলে অবস্থান করে আগুনের বিভিন্ন উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে।

চকবাজারের এই অগ্নিকাণ্ড আবারও পুরান ঢাকার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানীর পুরনো অংশে একই ভবনে দোকান, গুদাম ও বসবাসের ব্যবস্থা থাকার অভিযোগ নতুন নয়। কোথাও কোথাও বিপুল পরিমাণ পণ্য অল্প জায়গায় মজুত করা হয়। এর ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও জটিল হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, শুধু অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিস পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই যথেষ্ট নয়। অগ্নিঝুঁকি কমাতে ভবন নির্মাণের সময় থেকেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, জরুরি বের হওয়ার পথ খোলা রাখা, পর্যাপ্ত পানির উৎস ও ফায়ার-ফাইটিং ব্যবস্থা রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাহ্য পণ্য মজুত না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিদর্শন ও অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে তালাবদ্ধ গুদাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। কোনো মার্কেট বা গুদামে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ভেতরে প্রবেশের পথ যদি বন্ধ থাকে, তাহলে আগুনের উৎসে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে যদি প্রথমেই দরজা বা শাটার ভাঙতে হয়, তাহলে মূল্যবান সময় চলে যায়। সেই সময়ের মধ্যে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ের দীর্ঘ লড়াই দেখিয়েছে, একটি বড় মার্কেট বা গুদামে আগুন নিয়ন্ত্রণ কতটা কঠিন হতে পারে। ঘটনাস্থলে একাধিক ইউনিট কাজ করলেও সরু রাস্তা, পানির উৎস এবং ভবনের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জটিল করেছে।

আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ হওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণ। আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, কোন ধরনের পণ্য সেখানে মজুত ছিল, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং আগুন এত দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকার পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

এ ধরনের দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ। একটি দোকান বা গুদামে আগুন লাগলে শুধু ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বহু মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, ব্যবসার পুঁজি এবং জীবিকার উৎস মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পুরান ঢাকার মার্কেটগুলোতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। তাই বড় অগ্নিকাণ্ডের অর্থনৈতিক প্রভাবও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

চকবাজারের এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা হতাহতের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে দীর্ঘ ৩৭ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে হওয়া ঘটনাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আগুন যাতে আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে চেষ্টাও চালিয়েছেন।

পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে এখন নতুন করে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। শুধু একটি মার্কেট নয়, আশপাশের ভবন, গুদাম, দোকান এবং সড়কের কাঠামো একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা দরকার। কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকলে বড় অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসকে বাড়তি সমস্যার মুখে পড়তে হয়। একইভাবে সরু রাস্তা ও অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকা পথও জরুরি সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে।

চকবাজারের আগুন পুরোপুরি নিভে গেলেও এর মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বেশ কিছু পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, আগুনের কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে বড় বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

৩৭ ঘণ্টারও বেশি সময়ের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুনের শিখা শেষ পর্যন্ত নিভেছে। কিন্তু একটি অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত সমাপ্তি শুধু আগুন নেভানোর মধ্যেই নয়। আগুন কেন এত দ্রুত বা দীর্ঘ সময় ধরে ছড়াল, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

চকবাজারের মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছেন। ব্যবসায়ীরা চাইছেন ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব ও দ্রুত সহায়তা, আর সাধারণ মানুষ চাইছেন নিরাপদ পরিবেশ। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আগুন শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি কাজ এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি আগুন নিভে গেলেও নিরাপত্তার ঘাটতি থেকে গেলে পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা থেকেই যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com