প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নওগাঁর ধামইরহাটে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে একটি বসতবাড়িতে গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও বাসিন্দাদের উচ্ছেদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ পুলিশ মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার দিকে। তবে অভিযুক্তদের একজন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, জমিটির দখল মূলত তাদের ছিল এবং প্রতিপক্ষই তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে পুরোনো বিরোধের পাশাপাশি হামলা ও মামলা গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।
গত ১ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ধামইরহাট পৌরসভার দক্ষিণ ফার্সিপাড়া এলাকায় সোলাইমান আলীর বসতবাড়িতে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাড়ির পাঁচটি ইটের ঘর, দরজা-জানালা, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক মিটার ও টয়লেট ভাঙচুর করে। বাড়ির আশপাশের প্রায় ১২০টি কলাগাছসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ কেটে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে। এ সময় ঘরে থাকা মালপত্র, নগদ টাকা, সিলিং ফ্যান ও পানির মোটর নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন বাড়ির বাসিন্দারা।
হামলার সময় বাধা দিতে গেলে সোলাইমান আলী এবং তাঁর বড়মা গুলছিয়ারা বেগমকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে বাড়ির ভাড়াটিয়াদেরও মারধর করে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাতের মধ্যে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটির দরজা-জানালা ও বিভিন্ন অংশ ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকার কথা স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর আগে ১ অক্টোবরের ঘটনার পরপরই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে হামলা ও ভাঙচুরের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার পর তারা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মেহেরুল হাসান মেবু এবং রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল হামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ঘটনার ১২ দিন পরও পুলিশ মামলা নেয়নি বলে দাবি করেছেন সোলাইমান আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। একই বিষয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সোলাইমান আলীর পক্ষ থেকে একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জমির মালিকানা ও দখল। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আব্দুল কুদ্দুস ও শরীফ উদ্দিন আমাইতাড়া মৌজায় হাজেরা বিবি ও ময়েন উদ্দিন মণ্ডলের কাছ থেকে দুই দাগে মোট ১ দশমিক ০২ একর জমি কিনেছিলেন। পরে একই জমি তোজাম্মেল হকও কেনার দাবি করেন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিকানা নিয়ে ভূমি অফিসে শুনানিও হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জমিসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব্বির আহমেদ ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর তোজাম্মেল হকের নামে করা নামজারি বাতিল করেছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তোজাম্মেল হকের দাখিল করা ৩৫৮/১৯৭৪ নম্বর দলিলের স্বাক্ষর ও সিলে অসঙ্গতি পাওয়া যায় এবং সার্টিফায়েড কপিও উপস্থাপন করা হয়নি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তারা দাবি করছেন। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই নথি নিয়ে স্বাক্ষর ও সিলের গরমিলের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
তবে জমির বিরোধের অন্য পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। উপজেলা রিকশা ও অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল হামিদ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, জায়গাটির দখল মূলত তাদেরই ছিল এবং প্রতিপক্ষই তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। অর্থাৎ জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। এ অবস্থায় প্রকৃত মালিকানা, দখল এবং হামলার ঘটনায় কারা কী ভূমিকা রেখেছে—এসব বিষয় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইব্রাহিম হোসেন ও মেহেরুল হাসান মেবুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাড়িটির দীর্ঘদিনের ভাড়াটিয়া দুলাল হোসেন ও প্রতিবেশী আরিফুল ইসলাম জানান, তারা প্রায় ছয় বছর ধরে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। তাদের ভাষ্য, এই সময়জুড়ে জমিটি সোলাইমানদের দখলেই ছিল। হামলা ও ভাঙচুরের পর বাড়ির দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ভাঙা ও খোলা ঘরেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। একটি জমি নিয়ে বিরোধের প্রভাব কীভাবে নিরীহ ভাড়াটিয়া ও প্রতিবেশীদের দৈনন্দিন জীবনেও গিয়ে পড়ে, এই ঘটনাটি তারও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সোলাইমান আলীর অভিযোগ, ভূমি অফিসের নথিপত্র অনুযায়ী তারা বৈধ মালিক এবং দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর দাবি, আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টির সমাধান না করে রাতের আঁধারে বাড়িঘর ভাঙচুর ও উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, থানায় গিয়ে প্রতিকার চাইলেও তারা বিচার পাচ্ছেন না এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগ অবশ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিন্টু রহমান রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি আইনি জটিলতা ও আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও রায়ের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে জায়গাটিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে পুলিশের এককভাবে কিছু করার সুযোগ নেই। তবে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের অভিযোগে দেওয়া লিখিত অভিযোগটি কেন ফৌজদারি মামলা হিসেবে নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষ যদি অভিযোগ অনুযায়ী অন্য পক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, মারধর বা মালামাল নিয়ে যায়, তাহলে সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া আলাদাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ফলে জমির বিরোধ এবং কথিত সহিংসতার অভিযোগকে একই বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রতিটি অভিযোগের পৃথক আইনগত মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকারকর্মী নাইস পারভীনও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি মামলা বা আদালতের রায় থাকতে পারে, কিন্তু গভীর রাতে বাড়িঘর ভাঙচুর, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ আলাদা ধরনের অপরাধের প্রশ্ন তৈরি করে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া থেমে গেলে ভবিষ্যতে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঘটনার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী এনামুল হকও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার পরদিন তিনি প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন এবং পরে নিজেও ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেছেন। ধামইরহাটে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আগে ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হলেও এখন সেই তদন্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো, জমি নিয়ে বিরোধ শুধু কাগজপত্রের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের বসতভিটা, নিরাপত্তা ও জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। একটি বাড়ি ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি হয় না, নষ্ট হয় বহু বছরের সঞ্চয়, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। ভাড়াটিয়াদের ক্ষেত্রেও একইভাবে রাতারাতি বাসস্থান হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা নেমে আসে।
ধামইরহাটের এই ঘটনা তাই শুধু একটি জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এখানে একই সঙ্গে উঠে এসেছে ভূমি মালিকানা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ, আদালত ও ভূমি অফিসের সিদ্ধান্তের প্রভাব, বসতবাড়িতে হামলার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের নাম, পুলিশের কাছে অভিযোগ গ্রহণের প্রশ্ন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়। প্রতিটি স্তরেই তথ্য যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত মামলা গ্রহণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যে জমির দখল নিয়ে পাল্টা অভিযোগ এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনি জটিলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানানো হয়েছে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং যে পক্ষের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন।
জমি নিয়ে বিরোধের সমাধান আদালতের মাধ্যমে হতে পারে, কিন্তু এমন বিরোধ যেন সহিংসতা, ভাঙচুর বা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়, সেটিই স্থানীয় প্রশাসনের সামনে বড় দায়িত্ব। ধামইরহাটের এই ঘটনায় সেই দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হয় এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কীভাবে আইনগত প্রক্রিয়ায় আসে, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি। আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি—তারা প্রতিশোধ নয়, নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয় চায়; আর সেই আইনি প্রতিকার কত দ্রুত নিশ্চিত হয়, সেটিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত