প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরেশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তান। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পে সহযোগিতা, শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও গবেষণায় অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, ব্যবসায়ীদের নতুন যোগাযোগ তৈরি এবং দক্ষ কর্মীদের বিদেশে কাজের সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তিনজন প্রতিনিধির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তানের মধ্যে দ্বিতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বা এফওসি বৈঠকের ফাঁকে এসব দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং সরকারি পর্যায়ের আলোচনাকে বাস্তব বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
কিরগিজস্তানের অর্থনীতি ও বাণিজ্য উপমন্ত্রী মেদার তুমানভের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে তুলা উৎপাদন, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে দুই দেশের পারস্পরিক পরিপূরক সক্ষমতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি ইউরেশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি এবং ওষুধশিল্পে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগও আলোচনায় স্থান পায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজার খুঁজে বের করা জরুরি। কোনো একটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন, বাণিজ্যনীতি, পরিবহন ব্যয় কিংবা অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব রপ্তানিতে পড়তে পারে। এ কারণে ইউরেশিয়া অঞ্চলের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো এবং নতুন আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্যিক আগ্রহ যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, মূল্য প্রতিযোগিতা, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা, শুল্কনীতি, আমদানি বিধি এবং ক্রেতাদের চাহিদা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। জিএসপি সুবিধা কোথায় এবং কী শর্তে প্রযোজ্য, কোন পণ্য এর আওতায় আসবে এবং সুবিধা পেতে কী ধরনের নথি প্রয়োজন—এসব বিষয়ও রপ্তানিকারকদের কাছে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তানের আলোচনায় এই সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাই সম্ভাব্য বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস বা জিএসপি হলো নির্দিষ্ট শর্তে যোগ্য উন্নয়নশীল দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্কছাড় বা বিশেষ শুল্কসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা। তবে সব দেশ, সব পণ্য কিংবা সব বাজারে একই ধরনের সুবিধা কার্যকর থাকে না। কোন দেশের কোন পণ্য সুবিধা পাবে, তা সংশ্লিষ্ট বাজারের নীতি, পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত বিধি এবং অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করে। তাই ইউরেশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে সুবিধা কাজে লাগাতে হলে প্রযোজ্য বিধান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বৈঠকে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বিনিময়, বাণিজ্য প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণে এসব উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ নতুন বাজারে প্রবেশের আগে পণ্যের চাহিদা বোঝা, সম্ভাব্য অংশীদারদের যাচাই এবং সরবরাহের বাস্তবতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সরকারি পর্যায়ের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের জন্য যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বৈঠকে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি, বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি, যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন গঠন এবং দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়মনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া, ব্যবসায়িক ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এসব প্রস্তাবের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা, চুক্তি সম্পাদন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য কিরগিজস্তানে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের শ্রম, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসনবিষয়ক প্রথম উপমন্ত্রী আরলেন আলিয়াসভের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমিক চলাচল এবং বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। বৈঠকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিরগিজস্তানে ব্যাপক উন্নয়নকাজ চলায় দেশটি বিদেশ থেকে আরও কর্মী নিয়োগ করতে আগ্রহী।
আলোচনায় নির্মাণ, বস্ত্র, ওষুধশিল্প, ডিজিটাল সেবা, কৃষি ও শিক্ষকতার মতো খাতে বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ থাকার বিষয়টি উঠে আসে। এসব খাতে বাংলাদেশের কর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে কারিগরি দক্ষতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নির্দিষ্ট খাতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা কর্মীদের জন্য বিদেশি শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বৈধ কর্মভিসা, চাকরির চুক্তি, বেতন, কাজের পরিবেশ, আবাসন এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সম্পর্কে কর্মীদের আগেই পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগদাতা ও কর্মী পাঠানো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠকে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি সহযোগিতা গভীর করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কিরগিজস্তানের শ্রমবিষয়ক উপমন্ত্রী।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষা ও উদ্ভাবনবিষয়ক মন্ত্রী গুলজাত ইসামাতোভার সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়, যৌথ গবেষণা, যৌথ প্রকাশনা, বৃত্তি এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে কথা বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব। ভবিষ্যতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কিরগিজস্তানের শিক্ষামন্ত্রী।
উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং ভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও পেশাগত শিক্ষায় যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সুযোগ বাস্তবায়িত করতে হলে স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভর্তি-সংক্রান্ত নিয়ম, শিক্ষাব্যয়, বৃত্তির শর্ত এবং ভিসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বৈঠকে অননুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের কিরগিজস্তান ছাড়তে হবে না বলেও জানান দেশটির শিক্ষামন্ত্রী। এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও অনুমোদন যাচাই করে ভর্তি হওয়ার গুরুত্বও সামনে আসে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি বিধি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
পররাষ্ট্রসচিবের আমন্ত্রণে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন গুলজাত ইসামাতোভা। দুই দেশের প্রতিনিধিদের সফর ও নিয়মিত যোগাযোগ ভবিষ্যতে আলোচ্য বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের তাসখন্দে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ড. এম. মনিরুল ইসলাম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ইউরোপ ও সিআইএস অনুবিভাগের মহাপরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
সামগ্রিকভাবে কিরগিজস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও শিক্ষাকে একই সহযোগিতার কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে। জিএসপি সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা, ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের পথ তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব সুফলে পরিণত করতে প্রয়োজন হবে ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, কার্যকর চুক্তি, বাজারসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ-কিরগিজস্তান সম্পর্ক ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত