ন্যাশনাল ব্যাংকে আমানত ফেরত শুরু, শর্তে ৭ হাজার কোটি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
ন্যাশনাল ব্যাংকে আমানত ফেরত শুরু, শর্তে ৭ হাজার কোটি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও আমানত উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার পর গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে ব্যাংকটির স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনের আবেদন সংগ্রহ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গ্রাহকদের এই চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ধার পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে এই অর্থ ব্যবহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর শর্ত আরোপ করেছে।

আমানতকারীদের জন্য এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের ওপর নির্ভর করেই অনেক পরিবার দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনমতো টাকা তুলতে না পারলে ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বেতনভোগী কর্মী এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিজেদের সঞ্চয়ে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। তবে সব গ্রাহক একই সময়ে তাঁদের পুরো আমানত তুলতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, আবেদন নিষ্পত্তির অগ্রাধিকার এবং পরবর্তী অর্থ সরবরাহের ওপর।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর জানিয়েছেন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের চাপ কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যবসাও বাড়তে শুরু করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নেই। এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার থেকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আমানত ফেরতের পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখারও চেষ্টা চলছে।

১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সংগ্রহ করা আবেদনগুলো দেশের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রধান কার্যালয় থেকে শাখাগুলোতে অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে অন্য গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোন গ্রাহক কত টাকা এবং ঠিক কত দিনের মধ্যে পাবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত সময়সূচি প্রকাশিত হয়নি।

ব্যাংকটির আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সাত হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এই অর্থ সাধারণ ব্যবসায়িক ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়নি; বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে সোনালী ব্যাংক থেকে ধার হিসেবে নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই অর্থের সুদের হার ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ তিন মাস। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধার পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে। ফলে আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি অর্থের সঠিক ব্যবহার, নগদ প্রবাহের উন্নতি এবং ধার পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করাও ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থ ব্যবহারে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ধার করা অর্থ থেকে ব্যাংকের সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। পরিচালকদের নামে বা বেনামে থাকা আমানত পরিশোধেও এই অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ। একইভাবে সাবেক বা বর্তমান পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা বিনিয়োগ দেওয়া যাবে না। নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা আগে অনুমোদিত ঋণের অবিতরণকৃত অংশ ছাড় করার ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। এসব বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য হলো, জরুরি তারল্য সহায়তা যেন সাধারণ আমানতকারীদের দায় মেটাতে ব্যবহৃত হয় এবং তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যম না হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া ধার করা অর্থ দিয়ে বিদ্যমান আন্তব্যাংক দায় বা অন্য ব্যাংকে রাখা প্লেসমেন্টের অর্থ পরিশোধ, অন্য কোনো ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ এবং নির্দিষ্ট ঋণপত্রের দায় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্য ব্যাংকে আমানত হিসেবেও এই অর্থ রাখা যাবে না। গ্যারান্টি বহাল থাকা অবস্থায় নতুন করে সংগৃহীত আমানত শুধু তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং সাধারণ আমানতকারীদের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় পাঁচ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না এবং গ্যারান্টির অর্থ পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। অর্থ কীভাবে খরচ হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এই শর্তগুলো থেকে স্পষ্ট, ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য অর্থ সহায়তা পাওয়াই শেষ কথা নয়; বরং অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। ব্যাংকটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়, আমানত ফেরত এবং নগদ প্রবাহের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি থাকবে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ যেন নতুন ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এর ফলে ঋণ-আমানত অনুপাত দাঁড়ায় ১৩২ শতাংশ। সাধারণভাবে এই অনুপাত দিয়ে একটি ব্যাংকের আমানতের তুলনায় কতটা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তা বোঝা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্লেখিত নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংক প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। সেই হিসাবে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত নির্ধারিত সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ঋণ-আমানত অনুপাত বেশি হলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া ও দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ জোগাড় করা কঠিন হতে পারে। কারণ ব্যাংকের অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সব অর্থ নগদে পাওয়া যায় না। ঋণগ্রহীতারা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ না করলে কিংবা ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। এই উচ্চ খেলাপি ঋণের হার ব্যাংকটির আর্থিক দুর্বলতার একটি বড় সূচক এবং ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর পথে অন্যতম বাধা।

সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া ধার মিলিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ বা ধারসংক্রান্ত দায়ের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিমাণ দায়ের বিপরীতে ব্যাংকটির আয়, ঋণ আদায় এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হয়, তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাত হাজার কোটি টাকার নতুন সহায়তা সাময়িকভাবে আমানত ফেরতের চাপ সামলাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার অপরিহার্য।

ন্যাশনাল ব্যাংক ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার ফলে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসান ও আর্থিক সংকটে পড়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অতীতের অনিয়মের পাশাপাশি বর্তমান ঋণ ব্যবস্থাপনা, দায় পরিশোধের সক্ষমতা এবং পরিচালন কাঠামোর কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যাংকের পুনরুদ্ধার শুধু নতুন অর্থের ওপর নির্ভর করে না; বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা, ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপরও নির্ভরশীল।

সাধারণ আমানতকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁদের অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে এগোয়। আবেদনকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ব্যাংক কত দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে অন্য আমানতকারীদের চাহিদা কীভাবে পূরণ করে তার ওপর। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে পালন ও সাপ্তাহিক হিসাব প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব—একদিকে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিয়ে আস্থা পুনর্গঠন, অন্যদিকে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সাত হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা এই প্রক্রিয়ায় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও ঋণ-আমানত অনুপাতের মতো সমস্যার সমাধান ছাড়া স্থায়ী পুনরুদ্ধার কঠিন হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, কঠোর তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই ব্যাংকটির সংকট উত্তরণের পথ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com