প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। শরতের স্নিগ্ধ আবহ, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর নানা রঙের আলোকসজ্জায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পূজামণ্ডপ ইতোমধ্যে উৎসবের আবহে মুখর হয়ে উঠেছে। দেবী দুর্গার বোধন, আবাহন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পাঁচ দিনব্যাপী এই ধর্মীয় আয়োজন। ভক্তদের কাছে মহাষষ্ঠীর দিনটি তাই শুধু পূজার সূচনা নয়, বরং দেবীকে ঘিরে বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আনন্দের এক বিশেষ মুহূর্ত।
সনাতন ধর্মীয় রীতি ও পঞ্জিকা অনুযায়ী, মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়। বিভিন্ন মণ্ডপে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ, শাস্ত্রীয় আচার এবং বোধনের মাধ্যমে দেবীকে পূজার আসনে আহ্বান করা হবে। ধূপ-ধুনুচির সুবাস, পঞ্চপ্রদীপের আলো এবং ঢাকের তালে তালে ভক্তরা দেবীর আরাধনায় অংশ নেবেন। অনেক মণ্ডপে সকাল থেকেই পূজার প্রস্তুতি চলবে, আর সন্ধ্যার পর বোধন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে পরিবেশ।
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সমাজে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনেরও একটি বড় উপলক্ষ। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক বিশেষ সামাজিক পরিবেশ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই পূজাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় উৎসাহ ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে নতুন পোশাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ ঘুরে দেখা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতি।
এবারের দুর্গোৎসবেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর মণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পূজার দিনগুলোতে যাতে ভক্তরা স্বাচ্ছন্দ্যে মণ্ডপে যেতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে এবার ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেও উৎসবের ব্যাপক আয়োজন রয়েছে। ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মন্দির ও মণ্ডপে এবারের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপকে ঘিরে মানুষের চলাচল ও উৎসবের ব্যস্ততাও বাড়বে।
পূজার সময় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবারও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়, সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন এবং বিভিন্ন স্থানে রাত পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতি—সবকিছু বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। পূজামণ্ডপের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় ব্যাহত না হয়, সেটিই সংশ্লিষ্ট সবার অন্যতম প্রত্যাশা।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, ন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয়ের কাহিনি তাই যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সত্যের পক্ষে থাকার বার্তা বহন করে আসছে। পূজার প্রতিটি দিন সেই বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার দেবী দুর্গার আগমন ও গমন নিয়েও রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় ব্যাখ্যা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং বিজয়া দশমীর দিন নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন। দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। তবে মূল উৎসবের কেন্দ্রে রয়েছে দেবীর আরাধনা, শান্তি ও কল্যাণের প্রার্থনা।
মহাষষ্ঠীর পর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী হয়ে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা প্রবেশ ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজার আয়োজন আরও বিস্তৃত হবে। অষ্টমীতে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলিতে বিপুলসংখ্যক ভক্ত অংশ নেবেন। অনেক মণ্ডপে অষ্টমীর দিন বিশেষ প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। নবমীতেও চলবে পূজা-অর্চনা ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। এরপর দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এই উৎসব।
উৎসবের এই কয়েকটি দিনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি ব্যস্ততা। পূজাকে কেন্দ্র করে পোশাক, খাবার, পরিবহন, সাজসজ্জা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও অতিরিক্ত কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। মণ্ডপসংলগ্ন এলাকায় দোকানপাট ও খাবারের আয়োজন বসে। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও দুর্গাপূজার একটি প্রভাব পড়ে।
এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটির ব্যবস্থাও উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে বাড়তি স্বস্তি তৈরি করেছে। ২০ অক্টোবর নবমী উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে ছুটি এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে সাধারণ ছুটি রয়েছে। এর পাশাপাশি ২২ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সরকারি চাকরিজীবীরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাবেন। ফলে অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন এবং বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্গাপূজা শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতায় এটি দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একে অন্যের উৎসবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পান। পূজামণ্ডপে মানুষের যাতায়াত, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সম্প্রীতির চিত্রও ফুটে ওঠে।
মহাষষ্ঠীর সকালে তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই সঙ্গে উচ্চারিত হবে মন্ত্র, বাজবে ঢাক, জ্বলবে প্রদীপ। প্রতিমার সামনে ভক্তদের প্রার্থনায় উঠে আসবে পরিবার, সমাজ ও দেশের শান্তি এবং কল্যাণের প্রত্যাশা। কারও কাছে এটি দেবীর আরাধনা, কারও কাছে শৈশবের স্মৃতি, আবার কারও কাছে পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে কয়েকটি আনন্দঘন দিন কাটানোর সুযোগ। সব মিলিয়ে আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বহুল প্রতীক্ষিত শারদীয় দুর্গোৎসব। আগামী কয়েক দিন ধর্মীয় আচার, সংস্কৃতি, আনন্দ ও সম্প্রীতির নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুখর থাকবে দেশের পূজামণ্ডপগুলো।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত