চোরাচালান মামলায় পরোয়ানা, কমিটির পদ হারালেন যুবদল নেতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
চোরাচালান মামলায় পরোয়ানা, কমিটির পদ হারালেন যুবদল নেতা

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন সুমনকে। চোরাচালানসংক্রান্ত একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ জানিয়েছে, পরোয়ানা জারির পর তিনি আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন।

বেলাল হোসেন সুমন সুবর্ণচর উপজেলার চর আমানউল্যাহ ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি খাসেরহাট বাজারে রড ও সিমেন্টের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে বেলালের বিরুদ্ধে একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার তথ্য সামনে আসে। এরপর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে এবং গত বৃহস্পতিবার তাকে কমিটির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সুবর্ণচরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকিব ওসমান জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার বেলাল হোসেন সুমনকে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেছেন।

বেলালের বিরুদ্ধে যে মামলাকে কেন্দ্র করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি নোয়াখালীর হাতিয়া থানায় করা চোরাচালান মামলা। মামলার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর। ওই দিন হাতিয়া উপজেলার কালাবাহাদুর বাজারসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি ট্রলারে তল্লাশি চালায় কোস্টগার্ড। তল্লাশির সময় প্রায় ৭০০ বস্তা সিমেন্ট ও ৪০০ ক্যারেট কোমল পানীয়সহ চারজনকে আটক করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পণ্যগুলো মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাতিয়া থানায় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১০ মে হাতিয়া থানার উপপরিদর্শক সুমন চন্দ্র নাথ আদালতে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে বেলাল হোসেন ওরফে সুমনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগপত্রে থাকা অন্য ব্যক্তিরা হলেন মো. হান্নান, ইকবাল হোসেন, মো. রাশেদ রহমান, আইয়ুব নবী, মাহে আলম এবং এনায়েত উল্যা ওরফে এনাম মেম্বার। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও মামলায় প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

বেলালের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করে সুবর্ণচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল হাসান জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে থানায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজ পৌঁছায়। তবে পুলিশ জানতে পারে, ওই যুবদল নেতা গত বুধবার আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। অর্থাৎ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তিনি আদালতে গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামিন পেয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ওসি আরও জানিয়েছেন, এই মামলাটি ছাড়া বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে থানায় অন্য কোনো মামলা নেই। ফলে বর্তমানে আলোচনায় থাকা বিষয়টি মূলত হাতিয়া থানায় করা চোরাচালান মামলাকে কেন্দ্র করেই।

অন্যদিকে বেলাল হোসেন সুমন নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে ব্যবসা করে আসছেন এবং তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে চোরাচালানের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৯ সাল থেকে ফ্রেশ সিমেন্ট এবং ২০১৭ সাল থেকে ডায়মন্ড সিমেন্ট ও রড কোম্পানির পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করছেন।

বেলালের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি বিভিন্ন ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করেন। এরপর কোনো ক্রেতা সেই পণ্য কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সেটি তার পক্ষে সবসময় জানা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। হাতিয়া থানার মামলার ঘটনাটি সম্পর্কেও তিনি সরাসরি কোনো জ্ঞান থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে এনেছেন বেলাল। তিনি জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জনগণের ভোটে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বর্তমানে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।

বেলালের অভিযোগ, আসন্ন রাজনৈতিক ও স্থানীয় কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ তাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে মামলায় জড়িয়েছে। তাঁর দাবি, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মো. শাহজাহানের পক্ষে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ কারণে একটি পক্ষ তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিল। একই সঙ্গে তিনি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে ঘায়েল করতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন।

তবে বেলালের এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্তে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি কতটা সত্য এবং তিনি চোরাচালানের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন কি না, তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একজন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা একই সঙ্গে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আইনশৃঙ্খলা কমিটির মতো প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো মামলার তথ্য সামনে এলে প্রশাসনিকভাবে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই তার সদস্যপদ নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। আইনগতভাবে একজন আসামি আদালতের বিচারে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বেলালের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়াটিও স্বাভাবিক নিয়মে এগিয়ে যাওয়ার কথা।

মামলার অভিযোগপত্রে চোরাচালানের জন্য বিপুল পরিমাণ পণ্য মিয়ানমারে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিবহনের কথা বলা হয়েছে। সীমান্তবর্তী জলপথ ব্যবহার করে পণ্য পাচারের অভিযোগ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের ঘটনায় শুধু পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত নৌযান বা আটক ব্যক্তিদের ভূমিকা নয়, পণ্যের উৎস, মালিকানা, পরিবহনব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।

এই মামলায় তদন্ত শেষে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ফলে তদন্তকারী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য ও প্রমাণ পেয়েছে, সেটিও বিচারিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে বেলালের দাবি অনুযায়ী তিনি কেবল ব্যবসায়ী হিসেবে পণ্য বিক্রি করেছেন এবং ক্রেতা পণ্য কোথায় নিয়ে গেছেন তা জানতেন না—এই বক্তব্যের সত্যতা বা অসত্যতাও আদালতের সামনে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই হওয়ার কথা।

এদিকে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি বেলালের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে যুবদলের উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকায় তার বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক পদ হারানোর বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিরোধের ফল হিসেবে দেখার আগে মামলার নথি, তদন্তের তথ্য এবং আদালতের কার্যক্রম বিবেচনা করা জরুরি। একইভাবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই আগেভাগে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এখন সামনে রয়েছে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত। বেলাল হোসেন জামিনে থাকলেও মামলাটি চলমান থাকবে। অভিযোগপত্রে থাকা তথ্য ও প্রমাণ আদালতে পর্যালোচনা হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যপদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তও বহাল থাকবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়।

নোয়াখালীর এই ঘটনা স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন একই সঙ্গে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলার তথ্য সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বেলাল হোসেন সুমনের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যপদ হারানোর পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে চোরাচালান মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির দাবি করেছেন, আর পুলিশ জানিয়েছে তিনি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। ফলে ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে এখন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com