দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ১৫ জনের সাজা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ১৫ জনের সাজা

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেললাইনসংলগ্ন ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে দুই নারীসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। যৌথভাবে পরিচালিত এ অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৩ (এসআরবি-৩) অংশ নেয়। পরে আটক ব্যক্তিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হলে প্রত্যেককে তিন মাস করে কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

সোমবার বিকেলে দয়াগঞ্জ রেললাইন ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ঘুণ্টিঘর এলাকার একটি মাদক স্পটে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মাদক সেবন ও কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযানের সময় সেখানে থাকা অস্থায়ী কাগজের ছাউনি ও ঝুপড়িগুলোও ভেঙে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিতে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ থাকায় এ অভিযানকে স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেললাইনসংলগ্ন ঘুণ্টিঘর এলাকায় সকাল থেকেই মাদক কেনাবেচা ও সেবনের কার্যক্রম চলছিল। পরে বিকেলে এসআরবি-৩ ও ডিএনসির সদস্যরা ছদ্মবেশে সেখানে অভিযান শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা অনেকে পালানোর চেষ্টা করেন। কেউ দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, আবার কেউ আশপাশের দেয়াল টপকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতির মধ্যে অভিযান চালিয়ে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৫ জনকে আটক করা হয়।

অভিযানকালে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক এবং মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মাদক সেবনের জন্য ব্যবহৃত অস্থায়ী স্থাপনাগুলোও সরিয়ে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু একটি দিনের অভিযান চালিয়ে এ ধরনের স্পট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। নিয়মিত নজরদারি, অভিযান এবং একই সঙ্গে মাদকসেবীদের পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে পুনঃসম্পৃক্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

আটকের পর ১৫ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয়। আদালত তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা করে জরিমানা করেন। এর মধ্য দিয়ে অভিযানের তাৎক্ষণিক আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দয়াগঞ্জের মতো জনবহুল এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে শুধু অভিযান ও সাজা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ডিএনসি ঢাকা দক্ষিণের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, এ ধরনের মাদক স্পটে অভিযান চালানোর পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছু সময়ের জন্য সরে গেলেও পরে আবার ফিরে আসে। কারণ, তারা অনেকেই ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং স্থায়ীভাবে কোনো একটি জায়গায় অবস্থান করে না। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার একই স্থানে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে নিয়মিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা গেলে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দয়াগঞ্জের এই মাদক স্পটটি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে শনিবার একই এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে ও সহযোগীদের নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছিলেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানের সময় তাঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাওয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। অভিযানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর একজন জনপ্রতিনিধি ও সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।

ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। একজন সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো করে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া এবং সেখানে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সরকারের ভেতরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হওয়ার খবর সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আরও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

এরপর রোববার দেশজুড়ে সমালোচনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরদিন সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক হোসেন। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দয়াগঞ্জের একটি মাদক স্পটকে ঘিরে পরিচালিত একটি অভিযান মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়েও বড় আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে সোমবারের যৌথ অভিযানকে আগের ঘটনার বাইরে একটি নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের লক্ষ্য ছিল এলাকায় প্রকাশ্যে চলা মাদক কেনাবেচা ও সেবন বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। অভিযানের সময় অস্থায়ী মাদক সেবনের জায়গাগুলো উচ্ছেদ করাও ছিল কার্যক্রমের অন্যতম অংশ।

দয়াগঞ্জের মতো রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও কেনাবেচার ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ। রেললাইনসংলগ্ন বা পরিত্যক্ত জায়গাগুলো অনেক সময় মাদকসেবন ও কেনাবেচার জন্য ব্যবহার করা হলে আশপাশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের সামনে এমন কার্যক্রম চলতে থাকলে এর সামাজিক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

স্থানীয় পর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও সামাজিক উদ্যোগ। মাদকসেবীদের মধ্যে যারা আসক্ত, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা না গেলে কেবল আটক ও কারাদণ্ডের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা সরবরাহকারী ও মূল কারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

দয়াগঞ্জের সোমবারের অভিযানে ১৫ জনের কারাদণ্ড রাজধানীতে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান কার্যক্রমের একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত হলেও সংশ্লিষ্টদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এলাকাটিতে আবার যেন মাদকের কার্যক্রম গড়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা। অভিযানের পর অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও নিয়মিত নজরদারি না থাকলে একই স্থানে নতুন করে মাদকসেবীদের জড়ো হওয়ার আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, জনপরিসরের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল, মাদকবিরোধী অভিযান, সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে। মাদকবিরোধী কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দয়াগঞ্জের ঘটনায় একদিকে যেমন ১৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সামনে এসেছে রাজধানীর একটি পরিচিত মাদক স্পটকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে মাদক নির্মূল করতে ধারাবাহিক নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি। ফলে সোমবারের অভিযানকে কেবল একটি দিনের আইনগত কার্যক্রম হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি মাদকবিরোধী উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

রাজধানীর জনবহুল এলাকাগুলোতে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথও উন্মুক্ত করা জরুরি। কারণ মাদকবিরোধী লড়াই কেবল অপরাধ দমনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, জননিরাপত্তা, তরুণ প্রজন্ম এবং সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশের ভবিষ্যৎ। দয়াগঞ্জের এই অভিযান সেই বৃহত্তর বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com