প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন দিনগুলো পেরিয়ে আজ বুধবার এসেছে শুভ বিজয়া দশমী। মণ্ডপে মণ্ডপে এখন উৎসবের পাশাপাশি বাজছে বিদায়ের সুর। ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি, শঙ্খের আওয়াজ আর ভক্তদের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আজ শেষ হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজা-অর্চনা শেষে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় আয়োজন অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা।
দুর্গোৎসবের শেষ দিনে আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে গভীর আবেগ। কয়েক দিনের জন্য মণ্ডপে মণ্ডপে যে প্রাণচাঞ্চল্য, আলোকসজ্জা, আরতি, কীর্তন ও ভক্তসমাগম তৈরি হয়েছিল, আজ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তের চোখে থাকবে অশ্রু। বিদায়ের সেই মুহূর্তে প্রার্থনা থাকবে আগামী দিনগুলো শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক।
গতকাল মঙ্গলবার ছিল মহানবমী। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মহানবমীর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা সম্পন্ন হয়। পূজা শেষে অনুষ্ঠিত হয় হোম ও পুষ্পাঞ্জলি। ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মণ্ডপে আয়োজন করা হয় ভোগ ও আরতি। দিনভর চণ্ডীপাঠ, কীর্তন ও বন্দনায় মুখর ছিল পূজামণ্ডপগুলো।
মহানবমীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন মণ্ডপে আরতি। সন্ধ্যা নামার পর আলোকসজ্জায় সাজানো মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের অংশগ্রহণে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকের তালে, শঙ্খের ধ্বনিতে এবং আরতির আলোয় অনেক মণ্ডপে ফুটে ওঠে ভক্তি ও আবেগের অনন্য আবহ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পূজামণ্ডপে নবমীর রাতে ছিল উল্লেখযোগ্য ভিড়।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়ও মহানবমীতে ছিল উৎসবের আমেজ। পুরোনো ভবন, সরু রাস্তা, দোকানপাট ও বসতবাড়ির মাঝখানে স্থাপিত পূজামণ্ডপগুলোতে দিনভর ভক্তদের আনাগোনা ছিল। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মণ্ডপে এসেছেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে প্রতিমা দর্শনে বের হয়েছেন। ছোটদের চোখে ছিল উৎসবের কৌতূহল, আর প্রবীণদের মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যকে ঘিরে আবেগ।
তবে আনন্দের মধ্যেও নবমীর দিন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদায়ের অনুভূতি। কয়েক দিনের জন্য মণ্ডপে যে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, দশমীর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তা শেষ হবে—এই উপলব্ধি ভক্তদের মনে তৈরি করে বিষাদের আবহ। দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করার সময় অনেকেই শেষবারের মতো মনের কথা জানান। প্রার্থনা করেন পরিবার, সমাজ ও দেশের শান্তি ও মঙ্গল কামনায়।
আজ বিজয়া দশমীতে সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দশমীবিহিত পূজা সম্পন্ন করার আয়োজন রয়েছে। পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। এরপর স্থানীয় আয়োজন, আবহাওয়া ও প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। বিসর্জনের পর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করবেন এবং পরস্পরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাবেন।
রাজধানীতে বিজয়া দশমীর কেন্দ্রীয় আয়োজন ঘিরে রয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে বেলা ৩টার দিকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিমা পলাশীর মোড় এলাকায় সমবেত হওয়ার পর সম্মিলিত বাদ্য-বাজনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রা এগিয়ে যাবে।
শোভাযাত্রা শেষে সদরঘাটের ওয়াইজঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার আয়োজন রয়েছে। বিসর্জনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই রাজধানীর নদীতীরে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। তবে এবারও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার আগেই বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশনার কথাও জানানো হয়েছে।
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসব। কয়েক দিন ধরে পূজামণ্ডপগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় মিলনমেলা। প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা দেখা, মণ্ডপ পরিদর্শন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে উৎসবটি নগর ও গ্রামীণ জীবনে আলাদা আবহ তৈরি করে।
বিজয়া দশমীর বিদায়ের মুহূর্তে সেই মিলনমেলারও সমাপ্তি ঘটে। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করবে। কয়েক দিনের ব্যস্ততা শেষে ফিরে আসবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে ভক্তদের মনে থেকে যাবে পূজার স্মৃতি, আরতির আলো, ঢাকের শব্দ, মণ্ডপের সাজসজ্জা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন সময়।
দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এর অন্যতম বড় শিক্ষা হলো অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। দেবী দুর্গার বিদায়ের সময় ভক্তদের প্রত্যাশা থাকে, সমাজ থেকে অশান্তি, হিংসা, বিভেদ ও অন্যায় দূর হয়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই বিসর্জনের মুহূর্তে আনন্দের পাশাপাশি থাকে নতুন আশার বার্তাও।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। দিবসটি ঘিরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের আয়োজন রয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোও দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমীর তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির বার্তা বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে।
সারাদেশের মণ্ডপগুলোতে আজ সকাল থেকেই শেষ দিনের পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। কোথাও সীমিত পরিসরে, কোথাও শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হবে। পূজা শেষে ভক্তরা একে অন্যকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাবেন। স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, মিষ্টিমুখ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে বিজয়ার সামাজিক পর্ব।
দেবীর বিদায় মানেই উৎসবের শেষ, কিন্তু ভক্তদের বিশ্বাসে এটি কেবল সাময়িক বিদায়। আগামী বছর আবারও শরতের আকাশে সাদা কাশফুল, উৎসবের প্রস্তুতি এবং মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে শুরু হবে নতুন অপেক্ষা। আজ তাই অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্যেও থাকবে আগামী দিনের প্রত্যাশা। ঢাকের শেষ বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব; রেখে যাবে সম্প্রীতি, ভক্তি, ভালোবাসা ও নতুন আশার স্মৃতি।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত