প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও ডিম ছাড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সারা দেশে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পদ্মা নদীর বিভিন্ন এলাকায় থামছে না মা ইলিশ শিকার ও বিক্রি। কোথাও শত শত নৌকায় প্রকাশ্যে মাছ ধরা হচ্ছে, কোথাও নদীর পাড়ে বসছে অস্থায়ী বাজার। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের অভিযানের সময় জেলেদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। শরীয়তপুরের জাজিরায় অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর ৩৬ জেলেকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। একই সময়ে রাজবাড়ী, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ ও ফরিদপুরের সদরপুরেও অভিযান চালিয়ে জেলে আটক, মাছ ও নিষিদ্ধ জাল জব্দের ঘটনা ঘটেছে।
মা ইলিশ সংরক্ষণের এই সময়ে নদীতে অবৈধ মাছ ধরা শুধু আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের ইলিশসম্পদ, মৎস্যজীবীদের ভবিষ্যৎ আয় এবং নদীনির্ভর বহু পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। প্রজনন মৌসুমে পর্যাপ্ত ইলিশ ডিম ছাড়তে পারলে পরবর্তী সময়ে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্যদিকে, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নির্বিচারে মা ইলিশ শিকার চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন ও প্রাপ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং একই সঙ্গে জেলেদের জীবিকার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পালেরচর এলাকায় সোমবার সকালে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান চালাতে গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে প্রশাসন। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ আহমেদ আসলাম, জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান এবং জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব। অভিযানের খবর পেয়ে বা প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন জেলে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযানের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে জেলেদের একটি অংশ অতর্কিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে যান। একপর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকে ৩৬ জন জেলেকে আটক করা সম্ভব হয়। ঘটনার পর নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মাছ ধরার কার্যক্রম বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিরুনি অভিযান চালায়।
শরীয়তপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, পালেরচর এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় জেলেরা গ্রেপ্তারের ভয়ে অতর্কিতে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। একপর্যায়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান জোরদার করলে জেলেদের একটি অংশ পালিয়ে যায়। তবে ঘটনাস্থল থেকে ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রশাসনের অভিযানে হামলার ঘটনা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে। নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে নজরদারি চালানো, অবৈধ নৌযান শনাক্ত করা এবং জেলেদের নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে নদীঘেঁষা জনপদে মাছ ধরার সঙ্গে বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবন জড়িত থাকায় অভিযান পরিচালনায় প্রশাসনকে একদিকে আইন প্রয়োগ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলাতেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাউয়ালজানি, মুন্সিবাজার ও কলাবাগানসহ বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত নৌকায় প্রকাশ্যে ইলিশ ধরার খবর পাওয়া গেছে। নদীর পাড়ে অস্থায়ী বাজার বসিয়ে তাজা ইলিশ বিক্রি করছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এভাবে মাছ ধরা ও বিক্রি চলতে থাকায় নদীতে নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গত ১২ দিনে ৪২টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাল ও মাছ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ জন জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দৌলতদিয়া নৌপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ত্রিনাথ সাহা জানান, জনবলসংকট থাকা সত্ত্বেও মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গোয়ালন্দের পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন। নদীর বিভিন্ন প্রবেশপথ, মাছ ধরার সম্ভাব্য স্থান এবং নদীতীরবর্তী অস্থায়ী বাজারের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন। অবৈধভাবে ধরা মাছ যাতে সহজে বাজারজাত করা না যায়, সে জন্য মাছ বিক্রির স্থানগুলোতেও তদারকি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেলেদের বোঝানোও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলাতেও মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান চালিয়ে ছয় জেলেকে আটক করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের যৌথ উদ্যোগে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে জব্দ করা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাছ স্থানীয় একটি এতিমখানায় বিতরণ করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহার নদীর মাছসম্পদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। এসব জালে বিভিন্ন আকারের মাছ আটকা পড়তে পারে, ফলে শুধু মা ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছের পোনা ও ছোট মাছও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করার পাশাপাশি এসব জালের ব্যবহার, সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধেও নজরদারি জরুরি। নদীতে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষার স্বার্থে নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়মিত অভিযান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফরিদপুরের সদরপুরেও পদ্মা নদীতে অভিযান চালিয়ে তিন জেলেকে আটক করেছে উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর। সোমবারের ওই অভিযানে তাদের কাছ থেকে পাঁচ কেজি ইলিশ মাছ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ৮০ হাজার মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।
সদরপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আবরার বলেন, সরকার ঘোষিত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকার করলে জেলেদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
তবে এই পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নদী ও মাছের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার প্রতিদিনের আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরতে না পারলে তাদের আয় কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। এ বাস্তবতায় সরকারি সহায়তা সময়মতো পৌঁছানো, প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ রাখা এবং নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা হলে আইন মানতে উৎসাহ বাড়তে পারে। তবে জীবিকার সংকট কোনোভাবেই নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ শিকার বা প্রশাসনের ওপর হামলার বৈধতা দেয় না।
মা ইলিশ সংরক্ষণে সফলতা পেতে হলে প্রশাসনিক অভিযান, আইন প্রয়োগ, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং জেলেদের জন্য সহায়তা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। নদীতে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মাছের প্রজনন রক্ষার সুফল শেষ পর্যন্ত জেলে, ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং ইলিশের ওপর নির্ভরশীল পুরো অর্থনীতির কাছেই ফিরে আসতে পারে।
পদ্মার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক অভিযানে জেলে আটক, জাল জব্দ এবং প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা দেখাচ্ছে যে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এখনও উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে। সামনে বাকি সময়টুকুতে নদীতে নজরদারি জোরদার করা, অবৈধ মাছ বিক্রি বন্ধ করা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের জন্য ঘোষিত সহায়তা ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু একটি মৌসুমের সাফল্য হবে না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত