প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ ও আলোচনার ঝড় তুলে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ৭টি ইসলামী দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ মোর্চার। অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে পরিচিত হেফাজতে ইসলামের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতা ও নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন জোটটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সমমনা ইসলামী দল’। দেশের আলেম-ওলামা, ইসলামপ্রিয় জনগণ এবং ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসেবে এই নতুন প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হলো। নতুন এই জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইসলামভিত্তিক রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন জাতীয় রাজনীতি বিশ্লেষক ও আলেম সমাজ।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানী ঢাকার খিলগাঁওয়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মাখযানুল উলূম মাদরাসায় সমমনা ৭টি ইসলামী দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিস্তারিত আলোচনার পর সব দলের প্রতিনিধিরা একই ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার বিষয়ে চূড়ান্ত একমতে পৌঁছান। বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই জোটের বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমান। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, সমমনা ইসলামী দল প্ল্যাটফর্মে সাতটি প্রভাবশালী ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন একযোগে কাজ করার ব্যাপারে পুরোপুরি সম্মত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
নতুন এই জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর নাম প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে কৌতূহল ও ব্যাপক রাজনৈতিক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই জোটভুক্ত হওয়া সাতটি শীর্ষস্থানীয় ইসলামী দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র ও আলাদাভাবে সক্রিয় থাকা এই দলগুলোর একই ছাতার নিচে আসা ইসলামী ধারার রাজনীতিতে বড় ধরনের শক্তি বৃদ্ধির সোপান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমান নতুন এই ঐক্যের পটভূমি ও রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, শরীক দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি দল ইতিপূর্বে অন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় সেসব দল অন্য জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এই নতুন ‘সমমনা ইসলামী দল’ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই ঐক্য জোরদার করার লক্ষ্যে ও পরবর্তী কৌশলগত পদক্ষেপ নির্ধারণে আগামী ৫ ডিসেম্বর এই সাত দলের পরবর্তী শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
মহাসচিব সাজিদুর রহমান জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, হেফাজতে ইসলাম কোনো সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল না হয়েও সবসময় দেশ, জনগণ এবং ইসলামের সার্বিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকেই ইসলামী শক্তিগুলোর মধ্যে অনৈক্য দূর করে সবাইকে একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করতে শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে মূল অনুঘটক বা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে হেফাজতে ইসলাম। তবে তিনি একই সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিস্কার করেছেন যে, জোট গঠনে নেতৃত্ব দিলেও হেফাজতে ইসলাম তার ঐতিহ্যগত নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক চরিত্র ও স্বতন্ত্র ভূমিকা সর্বাবস্থায় অক্ষুণ্ণ রাখবে। সংগঠনটির এই মূলনীতি বজায় রেখে কেবল সার্বিক অভিভাবকত্ব ও সমন্বয় সাধনের কাজ সম্পন্ন করবে হেফাজত।
দেশের সাধারণ ইসলামপ্রিয় জনগণের চোখে বহু দিন ধরে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ দেখার এক ধরনের সুপ্ত আকুলতা কাজ করছিল। অতীতে নানা ইস্যুতে পৃথক দলীয় অবস্থান ও মতপার্থক্যের কারণে ইসলামী দলগুলো নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক উদ্যোগ সেই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সার্বিক নৈতিক অবক্ষয় রোধের ক্ষেত্রে এই মোর্চা একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খিলগাঁওস্থ মাখযানুল উলূম মাদরাসায় গত বৃহস্পতিবার সকালে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, রুদ্ধদ্বার ও শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ, সামাজিক নীতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরিচালিত হয়। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিনিধিরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে ও ইসলামের সুরক্ষায় এক প্ল্যাটফর্মে থেকে একযোগে রাজপথে সংগ্রাম ও ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি পরিচালনা করার ব্যাপারে শতভাগ একমত ও অঙ্গীকারাবদ্ধ হন।
বৈঠকের সফল সমাপ্তি শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব সাজিদুর রহমান। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশের সার্বিক জনমানুষ ও সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামক এই বিশেষ সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে সাতটি মূলধারার ইসলামী দল অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে এক হয়ে কাজ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই ঐক্য কেবল কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং এটি দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের পুঞ্জীভূত আকাক্সক্ষা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।
নতুন জোট গঠিত হওয়ার সংবাদ ছড়াতেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র কৌতূহল এবং নানা হিসাব-নিকাশের সূত্রপাত হয়েছে। জোটভুক্ত হওয়া এই সাতটি প্রভাবশালী ইসলামী দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। এতদিন পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজ নিজ স্বতন্ত্র ব্যানার, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে পৃথকভাবে মাঠে সক্রিয় থাকা এই প্রধান দলগুলোর একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে আগমনকে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব শক্তি বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমান নতুন এই বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গঠনের পেছনের পটভূমি এবং মূল লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দলগুলোর মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক জোট কিংবা শিবিরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমান সময়ে দেশ, জাতি এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামের বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী কল্যাণ নিশ্চিত করার তাগিদে তারা পূর্ববর্তী সকল রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে নিজেদের পথচলা ইতি টেনে এই নতুন ‘সমমনা ইসলামী দল’ প্ল্যাটফর্মে পূর্ণাঙ্গভাবে আত্মনিয়োগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই অভূতপূর্ব ঐক্যকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী, সুসংহত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী করতে আগামী ৫ ডিসেম্বর উক্ত ৭টি দলের পরবর্তী কৌশলগত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত করা হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব সাজিদুর রহমান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পুন ব্যক্ত করেন যে, হেফাজতে ইসলাম কোনোভাবেই সরাসরি সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কিংবা দলীয় ক্ষমতার মোহে পরিচালিত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ও দর্শন সর্বদাই দেশ, জনগণ, ঈমান ও ইসলামের কল্যাণ রক্ষা করা। সেই অকৃত্রিম দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই ইসলামী শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের বিভক্ত রাজনৈতিক অবস্থাকে দূর করে সবাইকে একটি অভিন্ন জাতীয় পতাকাতলে একত্র করার জন্য অভিভাবকসুলভ সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে হেফাজতে ইসলাম। তবে তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেন যে, নতুন এই জোটকে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সাহায্য জুগিয়ে গেলেও হেফাজতে ইসলাম সম্পূর্ণ নির্দলীয়, অরাজনৈতিক এবং স্বতন্ত্র আদর্শিক সত্তা হিসেবে নিজের অবস্থান আগের মতোই সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখবে।
দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলেম সমাজ ও ইসলামী দলগুলোর পারস্পরিক বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য একটি গভীর আকুলতা বিরাজ করছিল। অতীতের বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক সংকটকালে দলগত পৃথক অবস্থান ও মতপার্থক্যের দরুন ইসলামপন্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত দাবি ও লক্ষ্য অর্জনে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছিল। সমাজ পর্যবেক্ষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, সমমনা এই সাতটি দলের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ সেই বহুদিনের পুঞ্জীভূত শূন্যতা পূরণ করবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক ইনসাফ, নৈতিকতার বিকাশ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার ক্ষেত্রে এই মোর্চার কার্যক্রম অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ধনাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
এই নতুন শক্তির উত্থান বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাজপথের কর্মসূচি থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনে এই জোটের ভূমিকা কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও তীক্ষ্ণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে এই জোটের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, সম্ভাব্য কর্মসূচি ও কাঠামোগত ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিশ্চিতভাবেই গভীর আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত