ইতিহাসে চেরামন জুমা মসজিদের উজ্জ্বল ভূমিকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার বহু আগে ইসলাম ধর্ম ও তার সংস্কৃতি এই উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল—এমনই এক অজানা ও বিস্ময়কর ইতিহাস বহন করছে কেরালার ‘চেরামন জুমা মসজিদ’। ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিচুর জেলার কোডাঙ্গালু তালুকের মেথলায় অবস্থিত এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে, অর্থাৎ মাত্র পাঁচ হিজরিতে। ইসলামের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এই স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাহাবি মালিক বিন দিনার (রা.), যিনি উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

চেরামন জুমা মসজিদ ঘিরে রয়েছে কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক সত্যের মিশ্রণ। কাহিনিমতে, চেরামন পেরুমল নামের স্থানীয় রাজা এক রাতে স্বপ্নে আকাশের চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত হতে দেখেন। রাজসভায় কারও পক্ষেই সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর কিছুদিন পর আরব বণিকরা সমুদ্রপথে ভারতে আগমন করলে রাজা তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। আরব বণিকরা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী এবং তাঁর দ্বারা সংঘটিত মুজিজা, বিশেষ করে চাঁদ দ্বিখণ্ডনের ঘটনা রাজার কাছে বর্ণনা করলে তিনি বিস্মিত ও অনুপ্রাণিত হন। এরপর রাজা ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, চেরামন পেরুমল তাঁর রাজকার্যের দায়িত্ব অন্যদের অর্পণ করে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং সেখানে পৌঁছে সরাসরি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নতুন নাম রাখেন তাজউদ্দিন। কিছুদিন পর দেশে ফেরার পথে ওমানের ডুফর এলাকায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর পূর্বে মালাবারের স্থানীয় শাসকদের উদ্দেশে একটি পত্র রচনা করেন, যেখানে তিনি নিজের রাজ্যে মসজিদ নির্মাণ ও ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন।

তাঁর ইচ্ছানুসারে মালিক বিন দিনার (রা.), মালিক বিন হবিব (রা.) এবং তাঁদের সহযাত্রীরা কোডাঙ্গালুতে এসে রাজপত্রটি স্থানীয় শাসকদের হাতে তুলে দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে চেরামন জুমা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শুধু উপমহাদেশের প্রথম মসজিদ নয়, বরং ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারকালের এক অমূল্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।

মসজিদটির স্থাপত্য ও ইতিহাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা পরিবর্তন দেখেছে। একাদশ শতাব্দীতে এটি প্রথমবারের মতো সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে। ১৯৯৪ সালে মসজিদটির আয়তন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে মসজিদটির ভেতরে একটি প্রাচীন তেল প্রদীপ এখনো জ্বলছে, যা প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অবিরত আলো দিয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

চেরামন জুমা মসজিদ কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং কেরালার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। এখানে অমুসলিমরাও প্রবেশ করতে পারেন, এমনকি তাঁদের সন্তানদের হাতে খড়িও দেন। অনেক হিন্দু ভক্তও এখানে নির্দিষ্ট সময়ে প্রার্থনা করে থাকেন। ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই ব্যতিক্রমী চর্চা কেরালার ঐতিহ্যবাহী বহুমাত্রিক সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়।

আধুনিক যুগেও মসজিদটির গুরুত্ব কমেনি। ২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরব সফরের সময় বাদশাহ সালমানকে এই মসজিদের একটি প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) উপহার দেন। ভারত সরকার জাতিসংঘের সহায়তায় বর্তমানে এই মসজিদ ও আশপাশের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।

চেরামন জুমা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি উপমহাদেশে ইসলামের প্রাচীনতম আগমনের সাক্ষ্য বহনকারী একটি জীবন্ত ইতিহাস। মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্য উন্মুক্ত এই মসজিদ আজও ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত