৮৩ বছর বয়সেও কর্মক্ষম অমিতাভ বচ্চন, সুস্থ থাকার রহস্য জানালেন নিজেই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
৮৩ বছর বয়সেও কর্মক্ষম অমিতাভ বচ্চন, সুস্থ থাকার রহস্য জানালেন নিজেই

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী নায়ক হিসেবে পরিচিত অমিতাভ বচ্চনকে ঘিরে এখনও বিস্ময়ের শেষ নেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়ার কথা থাকলেও ৮৩ বছর বয়সে এসেও তিনি যেমন সিনেমায় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন, তেমনি টেলিভিশনের জনপ্রিয় শো সঞ্চালনার দায়িত্বও সুচারুভাবে পালন করছেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি শারীরিক নানা জটিলতার ভেতর দিয়ে গেলেও কর্মস্পৃহা বা উদ্যমে তার বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, তার লিভারের ৭৫ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ এত বড় সমস্যার মধ্যেও কীভাবে সুস্থ থেকে কাজ করে যাচ্ছেন, সেটিই এবার খোলাসা করেছেন বলিউড শাহেনশাহ।

অমিতাভ জানান, তার শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রবেশ করে আশির দশকের শুরুতে, যখন তিনি ‘কুলি’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। ১৯৮২ সালের সেই দুর্ঘটনায় শুটিং সেটে স্টান্ট করতে গিয়ে তার পেটে গুরুতর আঘাত লাগে এবং দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন তার শরীরে অতিরিক্ত রক্তের প্রয়োজন হলে ২০০ জন মানুষ রক্ত দান করেন। কিন্তু দাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত, এবং সেই রক্ত থেকেই অজান্তে সংক্রমিত হন অমিতাভ। ধীরে ধীরে এই ভাইরাস তার লিভারের বড় একটি অংশকে অকেজো করে দেয়।

বিগ বি জানান, সেই সময় তিনি মোটেও জানতেন না যে এ ধরনের ভয়াবহ রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু ২০০০ সালের দিকে পরীক্ষায় জানা যায় তার লিভারের ৭৫ শতাংশ কার্যক্ষমতা হারিয়ে গেছে। এর পরপরই আরেক দুঃসংবাদ আসে, তিনি যক্ষ্মাতেও আক্রান্ত হন। সেসময় দিনে আট থেকে দশটি ওষুধ সেবন করেই শুটিং ও সঞ্চালনা চালিয়ে গেছেন। বলা যায়, এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি নিজের ক্যারিয়ারকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

অমিতাভ বচ্চন স্বীকার করেছেন, চিকিৎসকের কঠোর পরামর্শ মেনে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন বলেই আজ এত বয়সেও কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন। তিনি জানিয়েছেন, এখন আর তিনি তেল-মশলাযুক্ত কিংবা ভারী খাবার খান না। মাছ-মাংস সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছেন খাদ্যতালিকা থেকে। বরং তার প্রতিদিনের মেন্যুতে থাকে ডাল, সবজি আর রুটি। অনেক দিন তিনি শুধু দই-ভাত খেয়ে দিন কাটান। এছাড়া নিয়মিত খান আমলা ও তুলসীর রস, যা তার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করছে।

শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, খারাপ অভ্যাস থেকেও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেছেন। ধূমপান ও মদ্যপান বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তিনি মনে করেন, এ সিদ্ধান্তই তাকে আজকের এই অবস্থায় টিকিয়ে রেখেছে। নিজের বক্তব্যে তিনি বারবারই জোর দিয়ে বলেছেন, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নেই।

অমিতাভ বচ্চনের দীর্ঘ জীবনের গল্প মূলত সংগ্রামের গল্প। অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে একের পর এক ব্যর্থতা, পরবর্তীতে সুপারস্টার হয়ে উঠলেও গুরুতর শারীরিক দুর্ঘটনা, প্রাণঘাতী রোগ এবং রাজনৈতিক ঝড়—সবকিছুই তিনি মোকাবিলা করেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। তার কর্মজীবনে যেমন ছিল তুমুল সাফল্য, তেমনি ব্যক্তিজীবনও কম কণ্টকাকীর্ণ ছিল না। কিন্তু প্রতিটি ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর তিনি আরও দৃঢ় হয়ে ফিরেছেন।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু বলিউড নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। বয়স যখন আশি পেরিয়েছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়া বা বিশ্রামে যাওয়াই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অমিতাভ এখনও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান অবলীলায়, এখনও নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করেন। আবার টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান কৌন বনেগা ক্রোড়পতি-তে তার প্রাণবন্ত উপস্থাপনা প্রমাণ করে, তিনি এখনও কতটা এনার্জেটিক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অমিতাভ বচ্চন বেশ সক্রিয়। প্রায় প্রতিদিনই ভক্তদের জন্য টুইট বা ব্লগ লিখে থাকেন। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত জীবন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের ছোট ছোট বিষয়ও শেয়ার করেন। অনেক সময় ভক্তদের উদ্বেগ দূর করতে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা খোলাখুলি জানান। তার সাম্প্রতিক এই বক্তব্যও ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে, যেখানে তিনি জানালেন—অসুস্থতা সত্ত্বেও শৃঙ্খলিত জীবনযাপনই তাকে এখনও সুস্থ রেখেছে।

অভিনেতার এই জীবনের অভিজ্ঞতা চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কারণ, লিভারের ৭৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও একজন মানুষ কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষম থাকতে পারেন, সেটিই অনেককে বিস্মিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অমিতাভের খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং মানসিক দৃঢ়তাই তাকে আজও কর্মক্ষম রেখেছে।

বলিউডের একাধিক তারকা এবং সমকালীন অভিনেতারা প্রায়ই প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, অমিতাভ বচ্চন তাদের অনুপ্রেরণা। শুধু অভিনয় নয়, ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম এবং সুস্থ থাকার জন্য তার লড়াইও তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। তিনি দেখিয়েছেন, জীবন যত প্রতিকূল হোক না কেন, শৃঙ্খলা আর ধৈর্যের মাধ্যমে প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করা সম্ভব।

সবশেষে বলতে গেলে, অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি জীবন্ত এক ইতিহাস। তার অভিনয়, তার কণ্ঠ, তার ব্যক্তিত্ব যেমন ভক্তদের মুগ্ধ করে রেখেছে, তেমনি তার জীবনযাপনের দর্শনও মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। ৮৩ বছর বয়সেও তার কর্মস্পৃহা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে আগামী প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত