প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫। নিজস্ব প্রতিবেদক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট বিভাগের প্রধান হাসপাতাল এমএজি ওসমানী হাসপাতাল বর্তমানে নানা সমস্যার মুখে রয়েছে। হাসপাতালের সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে রোগী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষের বিষয় উঠছে। এই প্রসঙ্গে হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তিনি সরেজমিনে হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে সেবার মান, কর্মী পরিস্থিতি এবং রোগীদের সুবিধার জন্য করণীয় বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা করেন।
সোমবার দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক হাসপাতালের পরিচালক ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের সেবা ও পরিচালনার উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালকে সিলেট অঞ্চলের মধ্যে একটি আদর্শ ও মানসম্মত চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানালেন, ওসমানী হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটি ৯০০ শয্যার একটি হাসপাতাল হলেও কর্মী সংস্থান রয়েছে মাত্র ৫০০ শয্যার জন্য। এমনকি রোগীর সংখ্যা অনেক সময় ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণে পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতি চিকিৎসা সেবায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “আজও হাসপাতালটিতে প্রায় ২৭০০ রোগী ভর্তি আছে। প্রতিটি রোগীর সঙ্গে থাকে ৩ থেকে ৪ জন এটেনডেন্ট। এত বিপুল সংখ্যক রোগী থাকলে সঠিকভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।”
অন্যদিকে, হাসপাতালের ভেতরে দালাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন। জেলা প্রশাসক জানান, দালাল দ্বারা রোগী চক্রবৃত্তি রোধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “ওসমানী হাসপাতালে কোনো দালাল ঢুকতে পারবে না। যারা চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কোনো ক্লিনিক যদি এখানে থেকে রোগী ভাগিয়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবও জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার সমস্যা দীর্ঘদিনের, যা রোগীদের সেবা গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। “আমি আগে একদিন রাতে এখানে এসেছিলাম। তখন দেখেছি অনেক অপরিষ্কার পরিবেশ। আমি নিজে প্রতি সপ্তাহে বা ১৫ দিনে একবার হাসপাতালে এসে প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। এটি নকল বা সাজানো নয়, বাস্তব চিত্র দেখার জন্য।”
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার আরেকটি দিক হলো গাড়ি পার্কিং। এখানে রোগী ও দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না থাকার বিষয়টি জেলা প্রশাসক হাইলাইট করেন। তিনি জানান, “গাড়ি পার্কিংসহ হাসপাতালের নানা সমস্যা আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। এরপর এগুলো সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবে সকলে মিলে চেষ্টা করলে অল্প সময়ে হাসপাতালটিকে একটি ভালো ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।”
জেলা প্রশাসকের এই পরিদর্শন ও ঘোষণা হাসপাতালের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের জন্য সেবার মান উন্নয়নের দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রোগী ও অভিভাবকদের সুবিধা এবং সেবার মান বৃদ্ধি করার বিষয়টি তার প্রশাসনিক অগ্রাধিকার। সেবা প্রদান ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তার এই দৃষ্টি হাসপাতালের কর্মী এবং রোগী উভয়ের জন্যই একটি সচেতনতা সৃষ্টি করবে।
ওসমানী হাসপাতাল, যা সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, সেখানে রোগীর চাপ এবং কম কর্মী সংস্থান দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা হয়ে আসছে। জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নির্দেশনায় এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে রোগীর সংখ্যা ও কর্মী সংস্থানের ভারসাম্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দালাল নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হবে।
একই সাথে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা এবং রোগী সেবার মান উন্নয়নে জেলা প্রশাসক নিজে সরাসরি পর্যবেক্ষণ চালাবেন। তার এই উদ্যোগ আশা জাগাচ্ছে যে, সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য ওসমানী হাসপাতাল কেবল চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, বরং একটি আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করবে।
সর্বশেষ, জেলা প্রশাসক নিশ্চিত করেছেন যে, হাসপাতালের সকল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পদক্ষেপ সময়মতো কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, “একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে ওসমানী হাসপাতালকে সিলেট অঞ্চলের একটি ভালো হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।”
এই পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন রোগী ও হাসপাতালের কর্মীদের জন্য সেবার মান বৃদ্ধি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।